Ahmad Al-Saba

“নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের দেহ ও চেহারার কোনো দিকেই তাকাবেন না। কিন্তু তিনি তাকাবেন তোমাদের অন্তর ও আমালের দিকে” – বুখারী ও মুসলিম শরীফ

সিরাহর উদ্দেশ্য; সিরাহ নাকি ফিকহুস সিরাহ? কোনটি প্রায়োগিক, বাস্তবসম্মত ও প্রাসঙ্গিক? – ১ম পর্ব

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

আলহামদুলিল্লাহ, সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য। যিনি আমাদেরকে তাঁর দয়ায় আচ্ছন্ন রেখেছেন আমাদের নাফরমানী সত্ত্বেও। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক মানবতার মুক্তির বাহক, রাহমাতাল্লিল আলামীন, আমাদের প্রিয় নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ﷺ এর উপর। সালাম বর্ষিত হোক তাঁর পরিবারের সকল সদস্যের উপর এবং সাহাবাদের উপর ও পূর্ববর্তী সকল সালফে-সালেহীনদের উপর যারা আমাদেরকে ইসলামের সঠিক পথ দেখানোর জন্য অনেক কষ্ট করে গেছেন।

monochrome_camels_w1

ব্লগের সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে অনেক সেটিংস ঠিকমত আসে না। এজন্য ভালোভাবে পড়ার জন্য আমি নীচের পিডিএফটি পড়তে অনুরোধ করবো।

 PDF LINK – http://tinyurl.com/pajwn4w

সিরাহ কি?

سار Saara – শব্দের অর্থ পথ অনুসরণ করা।

‘Seerah’ (سيرة) – এমন প্রস্তুত পথ যা গমন করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।

সিরাহ অর্থ ভ্রমণ করাও হয়। কারণ একজন ব্যক্তি যে পথ দিয়ে চলে গেছে সেই পথ দিয়ে আপনি তাঁর জীবনী পড়ছেন, তার মানে আপনিও তাঁর পথ দিয়ে ভ্রমণ করছেন। মানে আমরা রাসূল ﷺ  এর জীবনী পড়ছি মানে তাকে অনুসরণ করছি, তাঁর জীবনের পথে ভ্রমণ করছি।

 

সিরাহ অর্থ পথ; এমন পথ যেদিক দিয়ে মানুষ চলাচল করে। এজন্য সিরাহ বলতে জীবনী বুঝায় অর্থাৎ যে পথ দিয়ে একজন ব্যক্তি চলে গিয়েছে।

 

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ

“…আমরা একে প্রথম সিরাহয় বা পূর্ব পথে ফিরিয়ে দেবো”। – সূরা ত্বহা – ২১

কাজ বা একজন ব্যক্তি কেমন- সেটাও বুঝায়।

 

পারিভাষিক অর্থে বুঝায় – জীবনী বা বায়োগ্রাফি। অর্থাৎ যেকারো জীবনীকেই সিরাহ বলে। কিন্তু আমরা সিরাহ বলতে বেশিরভাগ সময়-ই রাসূল ﷺ এর জীবনীকেই বুঝাই।

 

সিরাতুন নাবাবীয়াহ হলো- রাসূল ﷺ এর জীবনে যা কিছু ঘটেছে, তাঁর সাথে সম্পৃক্ত, সরাসরি বা পরোক্ষভাবে, তাঁর সকল দিক- শারীরিক দিক, চারিত্রিক দিক, পারিবারিক জীবন, মিলিটারী দিক – সবই সিরাহর অন্তর্ভূক্ত।

সালফে-সালেহীনদের ইসলাম শিক্ষার উপকরণ

সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলতেনঃ

 আমরা আমাদের শিশুদেরকে রাসূল জীবনী শিক্ষা দিতাম যেরুপ কুরআনের সূরা শিক্ষা দিতাম

 

অর্থাৎ তাদের শিশুদেরকে গড়ে তুলার  জন্য সিরাহ ও কুরআন শিক্ষা দিতেন। এটাই ছিল তাদের ইসলামী সিলেবাস।

 

এজন্য শিশুদেরকে ভূত-পেত্নি বা গোপালভাড়ের গল্প না শুনিয়ে কুরআনের পাশাপাশি তাদেরকে নবী-রাসূলদের গল্প ও শিক্ষা দেওয়া দরকার। কারণ আমরা এর মাধ্যমে শ্রেষ্টদের শ্রেষ্ট ব্যক্তি ও শ্রেষ্ট যুগের শ্রেষ্ট সাহাবাদের পবিত্র জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করে আমাদের শিশুদেরকে সুন্দরতম চরিত্রের ওপর গড়ে তুলার প্রয়াস পাবো।

 

আমরা পূর্ববর্তী নবীদের কাহিনী কোথায় পড়ি? কোরআনে। তেমনি আমরা আমাদের নবীর জীবনী ও অন্যান্য শিক্ষা কুরআন ছাড়াও বিস্তারিত পড়ি সিরাহতে। সকল নবীর জীবনী পড়ি কুরআনে কিন্তু আমাদের নবীর সিরাহ পড়ি সিরাহ গ্রন্থেই।

 

তাবেয়িরা (রাহিমাহুমুল্লাহ) বলতেন:

আমরা শিশুদের প্রথম যে জিনিসটি শিক্ষা দিতাম সেটা হলো রাসূল এর জীবনী; যেন তাঁর জীবনের সাথে তাদেরকে সম্পৃক্ত করতে পারে”

 

এজন্য ছোটদের উপযোগী করে সুন্দর গল্পাকারে সিরাহকে তুলে ধরে শিক্ষাগুলোকে আদর্শীয় আকারে ভিডিও ও বই বের করা দরকার।

পবিত্র কুরআনঃ সিরাহ ও হাদীস

 

অনেকেই হাদীস মানেন না। এক্ষেত্রে সিরাহ তো প্রামাণিকতার দিক থেকে আরো দূর্বল মনে হতে পারে তাদের নিকট। আমরা কুরআন থেকে দেখার চেষ্টা করবো হাদীস ও সিরাহর ব্যাপারে এটি কি বলে।

 

যারা হাদীস অস্বীকার করে, তারা  কুরআনও যদি পড়ত গভীরভাবে, এই কুরআনেই ডাইরেক্ট হাদীস উল্লেখ পেতো!!  আল্লাহ নিজেই কুরআনে হাদীস উল্লেখ করেছেন!! আর তারা বলে আমরা কেবল কুরআন মানি হাদীস, মানি না…আসলে তারা কুরআন-ই কতটুকু বুঝে সেটা কুরআনের গভীর উপলব্ধি দিয়ে জানা দরকার।

 

হিজরতের কথা মনে আছে? আবু বাকার (রাজিয়াল্লাহু আনহু) যখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে নিয়ে শংকিত হলেন তখন তিনি কি বলেছিলেন? – “যখন তিনি তার সাথীকে বললেনঃ… ভয় পেয়ো নানিশ্চয় আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন…।” (সূরা তাওবাহ ৪০). আয়াতে আবু বাকার রাজিয়াল্লাহুর কথা উল্লেখ করেছেন সর্বনাম দিয়ে। কেবল আল্লাহর রাসূলের হাদীসই নয়, বরং যে একজন ব্যক্তির কারণে এই কথা কুরআনে এসেছে তাকেও উল্লেখ করেছেন আল্লাহ। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো এইটা ছিল মাক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় অথচ তখনো মাদানী সূরা নাযিল হয়নি এবং এই মাক্কী হাদীসটির ঘটনা আল্লাহ মাদানী সূরায় দীর্ঘ সময় পরেও উল্লেখ করেছেন!!

 

আর কুরআন আসছে কার মাধ্যমে? এইটাই বা জানবে কিভাবে? …সাহাবাদের মাধ্যমে নাকি আপনার কাছে সরাসরি আকাশ থেকে আসছে?…রাসূল ﷺ থেকেই তো…তিনি কি আপনাকে সরাসরি দিয়েছেন? না। তাহলে কাদের মাধ্যমে আসছে? সাহাবাদের মাধ্যমে?…তারা কি আপনাকে সরাসরি দিয়েছেন?…না। আল্লাহ কুরআনের বাহকদের হৃদয়ের কথা বলেছেন আর যেই কুরআন সাহাবাদের হৃদয় দিয়ে এসেছে আমাদের কাছে সেই একই হাদীসও এসেছে সেই আল্লাহর বর্ণনা করা হৃদয় থেকে।  তাহলে হাদীস অস্বীকার করতে হলে তো কুরআনও অস্বীকার করা দরকার!! কারণ একই হৃদয় থেকে দুটিই এসেছে। আর  কোরআন ও হাদীস – দুটোই তো একই ব্যক্তি রাসূল থেকে, একই হৃদয়বাহী সাহাবাদের মাধ্যমে, একই ধারায়, ক্রমান্বয়ে আমাদের কাছে  পৌছেছে। অথচ আমরা একটিকে স্বীকার করছি আরেকটিকে সুন্দরভাবে না জানার ফলে অস্বীকার করছি।

 

সূরা তাবাগুনে দেখবো কীভাবে নবী-রাসূল ও আল্লাহর বাণী দুটিই একই সূত্রে গাঁথা এবং একটিকে ছেড়ে দিলে অন্যটি অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।

আল্লাহ পূর্ববর্তী কাফিরদের মন্দ ফল ও শাস্তির কথা উল্লেখ করে সূরার ৬ নং আয়াতে বলেনঃ

(মন্দ ফল ও শাস্তির কারণ) এজন্য যে, তাদের নিকট তাদের রাসূল আসতেন স্পষ্ট নিদর্শনাবলীসহ। অতঃপর তারা বলতোঃ মানুষ-ই কি আমাদেরকে সৎ পথের সন্ধান দেবে? তারা কুফুরী করলোমুখ ফিরিয়ে নিল কিন্তু আল্লাহর কিছু আসে যায় না। আল্লাহ অভাবমুক্ত, অতি প্রশংসিত।

আয়াতটি সুক্ষ্ণ ও গভীর দৃষ্টি দিয়ে লক্ষ্য করুন;

১। কাফিরদের মন্দ ফল ও শাস্তির কারণ বলা হয়েছে।

২। কারণ ছিল কুফুরী করা ও মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।

৩। কিন্তু কি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল?— তাদের রাসূল থেকে, যিনি একজন মানুষ, সৎ পথের সন্ধান দেন।

৪। কিসের প্রতি কুফুরী করলো?—স্পষ্ট নিদর্শনাবলী বা আল্লাহর আয়াতসমূহ।

 

সুতরাং ইসলাম বা দ্বীন দুইটি জিনিস – (১) আল্লাহ বা ওহী আর (২) রাসূল বা বার্তাবাহক যা আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে এবং একটিকে অস্বীকার করা মানেও কিন্তু দ্বীনের অস্বীকার করা এবং তাঁরা কিন্তু এখানেই প্রথম অস্বীকারের প্রশ্ন করেছিল(মানুষ-ই কি আমাদেরকে সৎ পথের সন্ধান দেবে?)।

আর এই রাসূল তো কুরআন নয়—কোরআন তো স্পষ্ট নিদর্শনাবলী বা আল্লাহর বাণী।

তাহলে রাসূল কোথায় পাবো?

ইসলাম যে আল্লাহ ও রাসূল বা ওহী ও বার্তাবাহক এর সমন্বয় সেটাও আল্লাহ বলে দিলেন সূরার ১২ নং আয়াতেঃ

তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো ও রাসুলের অনুসরণ করো। আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আমার রাসূলের দায়িত্ব কেবল স্পষ্ট পৌছিয়ে দেওয়া।

 

ইসলাম কেবল যদি কোরআন-ই হতো তবে আরবীতে ‘ওয়াও’ বলা ও  ‘আতিয়ূ’ ক্রিয়া দুইবার বলাটাও ভুল হবে। কিন্তু কোরআনে কোনো ভুল নেই। এজন্য রাসূল ও বার্তা দুই – একটি কুরআন বা সরাসরি ওহী আরেকটি সুন্নাহ (যা হাদীস ও সিরাহ) থেকে আসে। এজন্যই ইসলাম দুইটি জিনিস – বার্তা ও বার্তাবাহক এবং একটিকে ব্যতীত অন্যটি ইসলাম হয় না আর আল্লাহ বলেও দিলেন ‘রাসূল এর দায়িত্ব’ (বার্তাবাহক) স্পষ্ট পৌছানো (ওহী)।

 

হে আহলে কিতাব! রসূলদের আগমনের ধারাবাহিকতা দীর্ঘকাল বন্ধ থাকার পর তোমাদের নিকট আমার রসূল এসে গেছেন সত্যকে সুস্পষ্ট করার জন্যে। যাতে তোমরা এ কথা না বলতে পারো যে, তোমাদের কাছে কোনো সুসংবাদদাতা ও কতর্ককারী আসেননি। কাজেই দেখ, এখন তোমাদের কাছে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এসে গেছে”।–(সূরা আল মায়েদাহঃ ১৯)

 

(সুসংবাদ)দাতা ও (সতর্ক)কারী তো ব্যক্তিবাচক আর ওহী তো ব্যক্তি নয় বরং সেটা ভিন্ন; ওহী। এই রাসূলের মাধ্যমেই কোরআন এসেছে। যদি রাসূল এবং তাঁর সত্যতা নাই থাকে তব তো ওহী বা কোরআনের আগমন-ই হুমকির মুখে পড়বে অবশ্যই। কারণ কোরআন তো আকাশ থেকে আসেনি আর আসলেও আমাদের কাছে আসেনি…আর আসলেও সেটা স্পষ্ট হবে কিভাবে একজন শিক্ষক ছাড়া? অথচ এটাকে স্পষ্ট পৌছানো হলেই না তখন কুফুরীর কথা আসে।

 

সুতরাং রাসূল বা নবী যে ওহী থেকে ভিন্ন এবং এই দুইটা মিলেই ইসলাম সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর ওহী, ব্যক্তি বা রাসূলও নয় যে ওহীকে আল্লাহর কাছ থেকে না পাঠিয়ে কুরাইশ থেকে পাঠানো হবে!!!

 

এজন্য রাসূলকে কুরআনের মাঝে যতটুকু পাওয়া যাবে সেটুকু নিতে হবে এবং এর বাইরেও হাদীস ও সিরাহ থেকে নিতে হবে অবশ্যই এবং এটা নেওয়ার কারণও কোরআনের নির্দেশ—কেননা তিনি কুরআন থেকে ভিন্ন সত্ত্বা আর এজন্য উনাকে না নেওয়া মানে ইসলাম অস্বীকার করা, ইসলামের অর্ধেক না নেওয়া, ইসলাম-ই না বোঝা; কুরআন স্পষ্ট হওয়া তো দূরের কথা, এগুলো একজন মানুষের মাধ্যমে হেদায়েত দেওয়াও (সূরা তাবাগুন) দূরের কথা আর এগুলো কুরআন, হিকমাহ ইত্যাদি শিক্ষা দেওয়াও (সূরা বাকারাহ-১২৯, সূরা জুমুআ-২) দূরার কথা। কারণ এগুলো করতে হয় একজন মানুষ দিয়ে, একজন রাসূল দিয়ে—যিনি ভিন্ন সত্ত্বা। এটা কুরআন নিজেই করতে পারে না। সুতরাং ওহী ও রাসূল দুইজন ভিন্ন সত্ত্বা। ওহী হলো কুরআন, আর রাসূল? রাসূল হলো সুন্নাহ (হাদীস ও সিরাহ)

 

হে আমাদের রব। তুমি এদের মধ্যে স্বয়ং তাদেরই কওম থেকে এমন এক রসূলের আবির্ভাব ঘটাও যে তাদেরকে তোমার আয়াত শুনাবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দেবে এবং তাদের জীবন পরিশুদ্ধ পরিমার্জিত করবে। (বাকারা: ১২৯)

 

কোরআন তো নিজেই আকাশ থেকে এসে কাউকে সতর্ক করে না, সুসংবাদ দেয় না, হিকমত শিক্ষা দেয় না। এগুলো তো একজন ব্যক্তিকেই করতে হয়।

 

এ দিক থেকে পশ্চিমারা ও ইসলাম বিদ্বেষীরা যেসব সমালোচনা করতেছেন রাসুল ﷺ এর – সেগুলোর কারণে তো পূর্ণ ওহী-ই প্রশ্নের মুখে থুবড়ে পড়ছে। তারা রাসূল ﷺ কে ধুয়ে দিয়ে গ্রন্থ তৈরি করছে ইতিহাসের আলোকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আর আপনি কেবল কুরআনের একটা দুইটা আয়াত দিয়ে বললেন দেখো আল্লাহর রাসূলের চরিত্র সর্বাপেক্ষা উত্তম, খুলুকুন আজিম।

 

আরে ভাই, তারা তো কুরআনই মানে না, আর যেই ব্যক্তির মাধ্যমে সেই আসছে তাকেই তো গ্রহণযোগ্য মনে করছে না…সুতরাং কোরআন তো অনেক পরের বিষয়…শিকর-ই তো তাদের নিকট ঠিক নেই।

 

সুতরাং কোরআন সঠিক এইটা প্রমাণের আরেকটি বিষয় হলো রাসুল  ﷺ কেমন ছিলেন এইটা প্রমাণ করা। আর আপনি এমন মানুষ যিনি কুরআন বোঝওয়ালা দাবি করেও কুরআনও যে বুঝেন না সেটা তো আয়াত দিয়েই প্রমাণিত হলো আর আপনি সিরাহর চাইতে বেশি প্রামাণিক (রিজাল শাস্ত্র ও সনদের ধারাবাহিকতা) হাদীসকেই অস্বীকার করেন আর সিরাহ তো আরো দূরে। সুতরাং আপনার ইসলামের গোড়াই তো ভুল প্রমাণিত হচ্ছে, যে ব্যক্তির মাধ্যমে কোরআন এসেছে তাঁর চারিত্রিক অসাধুতার কারণে; পশ্চিমাদের অভিযোগের ভিত্তিতে।

 

আপনি কি আপনার বোনকে ধর্ষকের সাথে বিয়ে দেবেন? কেন দেবেন না? চরিত্র খারাপ। আপনি কি একজন প্রতারকের সাথে লেনদেন করবেন? লোভী ব্যক্তির সাথে চলাফেরা করবেন? না। কিন্তু এই অভিযোগই তো আপনার বার্তা-র বাহককে দেওয়া হচ্ছে। সুতরাং যেই বার্তাবাহক-ই রিলায়েবল না, তাঁর বার্তা (কোরআন) কীভাবে রিলায়েবল হতে পারে? ইসলাম সত্য হয় কিভাবে?

 

সুতরাং ইসলামের মৌলিকতা, এর সত্যতা পুরোটাই প্রাথমিকভাবে রাসূলের সত্যতা, পবিত্রতা, রাহমাহ, চরিত্রর ইত্যাদির উপর নির্ভর করে। এজন্যই তাঁর সিরাহ এতো এতো গুরুত্বপূর্ণ।

 

আর এদিকটা লক্ষ্য করেই আল্লাহ বলেছেন সূরা ইয়াসিনে ১-৫ নং আয়াতে কুরআন এবং রাসূল- উভয়ের কথাই বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে কোরআন প্রজ্ঞাময়, আল্লাহর থেকে আসছে আবার বলা হচ্ছে রাসূল অবশ্যই সৎ পথের উপর আছে। সুতরাং দুইটার সার্টিফিকেটই লাগবে।

 

বার্তাবাহক যদি অসৎ হয় তবে তাঁর বার্তাও কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আমরা সেই বার্তাবাহক সম্পর্কেই বিস্তারিত জানি না আর এই সুযোগেই বার্তাবাহককে অসৎ, চরিত্রহীন, লম্পট ইত্যাদি প্রমাণ করে ইসলামের মৌলকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে পশ্চিমারা আর আমরা নিজেরাও বাস্তব শিক্ষা পাচ্ছি না যেভাবে আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর জীবনের পর্যায়গুলোতে ইসলাম কায়েম করেছিলেন সেভাবে। সুতরাং সবগুলো লেভেলে আমাদেরই ক্ষতি।

 

কুরআন হলো পূর্ববর্তী সমস্ত আসমানী কিতাবের নির্যাস। এখানে যত কিছুই বর্ণিত হয়েছে সেগুলো আমাদের হেদায়েতের উৎস, সবই। একারণে ইহুদি-খৃষ্টানদের বর্ণনা মানে তাদের বর্ণনাই কেবল নয় বরং আমাদের জন্য তাদের ভুল থেকে সৎ পথে থাকার শিক্ষা ও সতর্ক বার্তা। পূর্ববর্তী নবী-রাসূলরা তাদের গোত্রের নিকট কীভাবে দাওয়াত দিয়েছেন সেটা আমাদের কুরআনে আনা মানে এমনিতেই ইতিহাস পড়ানো নয়, বরং সেগুলো থেকে ঠিক শিক্ষাগুলো নেওয়া।

 

এবার সূরা নূহ-তে হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম) এর দিকে একটু তাকানো যাক।

২ নং আয়াতে বলা হচ্ছে নূহ (আলাইহিস সালাম) – সতর্ককারী হিসেবে এসেছেন।

৩ নং আয়াতে বলা হচ্ছে – আল্লাহর ইবাদাহ কর, তাকে ভয় করো কিন্ত…এরপরে?…”আমার অনুসরণ কর”। তার মানে এখানেই স্পষ্ট বলে দিচ্ছে তাঁর ধর্ম ছিল আল্লাহর ওহী এবং তিনি বা বার্তাবাহক। এর মাধ্যমে আমাদেরকেও একই শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে—আল্লাহর ওহী ও সতর্ককারী হিসেবে আল্লাহর রাসূল ﷺ. এরপর চলতে থাকুন অন্যান্য কথায়…

 

চলে আসলেন সূরার ২১ নং আয়াতে – নূহ (আলাইহিস সালাম) বললঃ হে আমার রব, নিশ্চয় তারা আমাকে অস্বীকার করেছে…। এরপর?…এরপর আল্লাহ তাদের সমস্ত পাপের জন্য শাস্তি দিয়েছিলেন…এ পাপ সমূহের মাঝে ‘তারা আমাকে অস্বীকার করেছে’ও রয়েছে। অর্থাৎ নবীকে অস্বীকার করাটাও শাস্তির কারণ; কারণ তিনিও দ্বীনের অংশ এবং অস্বীকারের শাস্তি তো হবেই।

সুতরাং আল্লাহর দ্বীন হলো আল্লাহর ওহী ও বার্তাবাহক।

 

আল্লাহ কুরআনে রাসূল এর নবুওয়াতপূর্ব জীবনকে উল্লেখ করেছেন অর্থাৎ আল্লাহ রাসূল ﷺ এর সিরাহকে উল্লেখ করেছেন, নবুওয়াতের দাবির সত্যতার পক্ষে। আরো আশ্চর্যের বিষয় হলো এখানে রাসূল ﷺ বলেননি বরং আল্লাহ-ই রাসূল ﷺ কে আদেশ দিচ্ছেন ‘তুমি বল’ অর্থাৎ আল্লাহই তাঁর নবুওয়াতের ভিত্তিকে রাসূল এর সিরাহর উপর রেখে দিলেন!! সুতরাং এই সিরাহকে উপলব্ধি করেননি মানে নবুওয়াত-ই উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আল্লাহ বলেনঃ

তুমি বল, আল্লাহ চাইলে আমি তোমাদের নিকট এটি পাঠ করতাম না আর না এটা জানাতাম তোমাদেরকে। কেননা এর পূর্বেওতো আমি তোমাদের মাঝে জীবনের এক দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছি; তবে কি তোমরা এতটুকুও আকল/জ্ঞান খাটাও না?

– ইউনুস: ১৬

অর্থাৎ এখানে দ্বীনের ভিত্তিকেই নবুওয়াতপূর্ব জীবনের সমস্ত চারিত্রিক দিককে লক্ষ্য করেই আবির্ভূত হচ্ছে। আর আমরা যদি এই নবুওয়াতপূর্ব জীবন বা সিরাহকে ভালো করে নাই জানি, তবে আমরা নবুওয়াতের বাণীসমূহকে কীভাবেই বা পৌছাবো অথবা যে ইসলাম বিদ্বেষীরা রাসূলের জীবনকে কলোষিত করে রাসূলের জীবনের ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে, ইসলামের মূলকে আছড়ে ফেলছে, সেগুলোকেই বা কীভাবে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে ঠেকাবো।

 

সুতরাং সিরাহর উপলব্ধি না জানলে আমরাই কীভাবে সেই ভিত্তি-মূলের মত হতে পারবো, অথবা কীভাবেই বা আমরা নিজেরাই ইসলাম সঠিকভাবে বুঝতে ও পালন করতে পারবো বা তাঁর মত করে নবুওয়াতের বাণী পৌছাবো অথচ আমরা তাঁর মত হবো সেটা তো অনেক দূরে, তাঁর ব্যাপারেই জানি না।

 

আল্লাহ ইসলামকে গ্রহণের রেফারেন্স হিসেবে এনেছেন তাঁর জীবনী—সুতরাং তাঁর পূর্ব জীবনের সমস্ত বিস্তারিত না জানা মানে হেদায়েত ও পূর্ণ ইসলাম না বোঝার শামিল।

সিরাহ কেন পড়ব? প্রয়োজনীয়তা কী?

আমরা এখন সালফে-সালেহীন, স্কলার, বিভিন্ন দাঈ এবং সিরাহর উপর কাজ করেছেন এমন আলেম ও বিশেষজ্ঞদের থেকে সিরাহর উদ্দেশ্যগুলো তুলে ধরব। তাদের মধ্যে – ড. শাইখ ইয়াসির কাদি, ড. তারিক রামাদান, শাইখ আব্দুর নাসির জাংদা, ইমাম আনওয়ার আল-আওলাকী (রাহিমাহুল্লাহ), শাইখ ড. সাঈদ রামাদান আল-বুতি (রাহিমাহুল্লাহ), ড. জামাল বাদাওয়ী, নুমান আলী খান, ড. আলী সাল্লাবি, ড. মোস্তফা হুসনী আস-সিবাঈ (রাহিমাহুল্লাহ),  ইত্যাদি।

বিখ্যাত আলেম ড. সাঈদ রামাদান আল-বুতী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর সুবিখ্যাত বই ‘ফিকহুস সিরাহ’ গ্রন্থে বলেনঃ

“রাসূলের জীবনী অধ্যয়ন মানে কেবল ইতিহাস বা ঘটনা পড়া নয় বরং রাসূলের জীবনে অন্তর্ভূক্ত জীবন্ত ইসলামকে অধ্যয়ন করা; কেবল একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি, নেতা বা বিচারক হিসেবে নয়, এগুলো একজন ব্যক্তির জন্য মুখরোচক হতে পারে কিন্তু প্রকৃত উদ্দেশ্য নয়। সবার উপরে আল্লাহর নবী ও বার্তাবাহক হিসেবেই তাঁর জীবনী অধ্যয়ন করতে হবে”।

 

শাইখ মুহাম্মাদ আল-গাযালি (মিশর)(ইনি কিন্তু ইমাম গাজ্জালি রাহিমাহুল্লাহ নয়) এর বর্ণনা এরকম –

“অনেক ঐতিহাসিক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবনী লিখেছেন। তারা রাসূল  এর জীবনের বিভিন্ন দিক বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ‘ফিকহুস সিরাহ’র উদ্দেশ্য হলো কোনো কিছু কোন উদ্দেশ্যে ঘটেছিল তার বর্ণনা থাকে যাতে সেগুলোকে বর্তমানের প্রেক্ষিতে বাস্তবে আমরাও প্রয়োগ করতে পারি। এটা যেন প্রাচীন ইতিহাসের জীবন্ত ও আধুনিক ব্যাখ্যার সমন্বয় ও সমসাময়িক প্রায়োগিক দিক। এটি করার উদ্দেশ্য হলো বর্তমানে ঈমানকে জীবন্ত রাখা, চারিত্রিক পবিত্রতা বজায় রাখা, আধুনিক সমস্যাগুলোকে মোকাবিলা করা ও ঈমানের প্রতি দৃঢ় থাকা। বাস্তবতা হলো রাসূল   এর জীবনী সংরক্ষণের উদ্দেশ্য বাস্তবিক প্রয়োগ; বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা বা আনন্দ দান করা নয়”।

 

শাইখ মুহাম্মাদ আল-গাজালি আরো বলেনঃ

“আপনি হয়তো ভেবেছেন ইতিহাসের আলোকে রাসূল ﷺ এর জীবনী পড়েছেন জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কিন্তু এটা মস্ত বড় ভুল। আপনি আসলে রাসূল ﷺ এর জীবনী ততক্ষণ পর্যন্ত পড়েন নি যতক্ষণ না কুরআন মাজীদ ও বিশুদ্ধ সুন্নাহ অধ্যয়ন করেছেন। এই দুটি উৎস থেকে যতটুকু আপনি উদঘাটন করতে পেরেছেন সেগুলোই আপনাকে রাসূল ﷺ এর জীবনের সাথে শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দেবে (যে আপনি আসলেই কিছু জেনেছেন ও সে মতে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন)”।

 

প্রকৃতপক্ষে আমরা যেই সমস্যাগুলোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছি এবং এগুলোর যে সুনির্দিষ্ট সমাধান পাচ্ছি না, সেটা হয়েছে প্রধানত সিরাহর উদ্দেশ্যগুলো না জানার কারণে এদিকে আগাতেও পারিনি এবং সমস্যাগুলোর সমাধানও হয়নি।

 

অবাক করা বিষয় হলো সালফে-সালেহীনদের প্রাথমিক জীবন থেকে কুরআনের সাথে সিরাহ পড়ার অভ্যাস ছিল—দুটি একই সাথে যেতো। অর্থাৎ তাদের ইসলামের প্রাথমিক ও মৌলিক সিলেবাস কুরআন ও সিরাহ।

 

কিন্তু পরবর্তীতে এটি হারিয়ে গেছে নানাবিধ কারণে।

 

কারণ পূর্ববর্তী লোকেরা সিরাহ পড়ত এ থেকে আমল করার জন্য, সুন্দর চারিত্রিক এবং অন্যান্য জিনিস নেওয়ার জন্য। কিন্তু যখন থেকে সিরাহ বলতে একটি বই, এর কিছু ঘটনা, কিছু ফ্যাক্ট এর বর্ণনা মৌলিক হয়ে দাঁড়ায়; শিক্ষা চাপা পড়ে যায়, তখন থেকেই এটি যেন শুকনো পাতার মত হয়ে পড়েছে—এর কার্যকারিতা শেষ

অথবা এটি যেন গল্পাকারে তুলে ধরা হচ্ছে কিন্তু শিক্ষাগুলোকে ভুলে গিয়ে ইতিহাসনির্ভর করে তুলা হয়েছে যেন অতীতকালীন কোনো ঘটনা পড়ছি যেগুলোর সাথে আমাদের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ এগুলোকে প্রাচীনকালের রুপকথায় রুপান্তরিত করা হয়েছে।

অথবা সিরাহকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যার মাধ্যমে হয়তো বর্ণনার সময় পর্যন্ত খুবই অভিভূত থাকি  কিন্ত এটি শেষ হওয়ার পর আর কোনো প্রভাব থাকে না। কারণ এগুলো আমাদের কাছে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যার সাথে আমাদের বর্তমান জীবনের সাথে কোনো সম্পৃক্ততা খুঁজে পাই না। আমরা অভিভূত কিন্তু ১৪০০ বছর পর বর্তমানে আমাদের জীবনে এর প্রয়োজনীয়তা বা উপকারিতা কি?

 

এটি যেন ইতিহাসের ধারাবাহিক আলোচনা এবং কিছু ফ্যাক্ট এর রুপের বর্ণনা হয়েছে। এই দুটি উপাদানই দরকার কিন্তু সেই সাথে এই দুটির সাথে আরেকটি উপাদানও দরকার এবং এটিই আমাদের জন্য সর্বাপেক্ষা বেশি প্রয়োজন। আর সেটিই হলো – ফিকহুস সিরাহ বা সিরাহর উপলব্ধি।

 

প্রকৃতপক্ষে সিরাহর উদ্দেশ্য ছিল আমি আসলে এ থেকে কি নিতে পারি, কিরকম উপকারিতা পেতে পারি।

 

আমাদের দরকার ছিল সিরাহর বাস্তবতা ও প্রাসঙ্গিকতা। কীভাবে আমাদের জীবনে এটি প্রয়োগ করতে পারি, কি শিক্ষা নিতে পারি এই সিরাহ থেকে। এই বাস্তবতা থেকেই প্রশ্ন আসে এগুলো পেতে হলে  আমি কীভাবে সিরাহ পড়বো, কোন পন্থায় এই বাস্তবতা, প্রাসঙ্গিকতা ও উপকারিতা পাওয়া যাবে।

 

আমরা অনেকেই যেমন কোরআনের অনুবাদ পড়ে থেমে থাকি কিন্তু এর থেকে প্রকৃত যে উপকারিতা পাওয়ার কথা ছিল সেটা নেই না। সিরাহর ক্ষেত্রেও আমাদের যেন সেরুপ না হয় যে আমরা সিরাহ পড়লাম, কিছু ইতিহাস, ফ্যাক্ট ও ঘটনার ধারাবাহিকতা পড়লাম কিন্তু এর থেকে আসল উদ্দেশ্য যে শিক্ষা সেটাই নিতে পারলাম না।

 

ড. জামাল বাদাওয়ী বলেন ইসলামী স্কলার ড. রাজেহ আল-কুরদী বলেছেনঃ

“সিরাহ মুসলিমদের ঈমান ও আকীদার সাথে সম্পর্কযুক্ত। কারণ মুসলিমদের আকীদা দুইটি বিষয়ের সাথে যুক্ত- এই দুটোর স্বীকৃতি দেওয়া (১) আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং (২) মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। মুহাম্মাদকে আল্লাহর রাসূল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া মানে তাকে নেতা হিসেবে মেনে নেওয়া এবং এই স্বীকৃতি তাঁর জীবনী, শিক্ষা ও পথ প্রদর্শনকে অধ্যয়নের জন্য নির্দেশ করে, দাবি করে। কারণ একজন ব্যক্তি এভাবেই আল্লাহর রাসূলের উদাহরণ দেখে আল্লাহর ইবাদাহর সব কিছুকে বাস্তবায়ন করে। এজন্য-ই আল্লাহ তাকে ‘উসওয়াতুন হাসান’ বলে উল্লেখ করেছেন”।

 

কেন সিরাহ পড়বো সেগুলোর বিস্তারিত নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্ট জানা দরকার, তবে সিরাহর প্রতি আমাদের দৃষ্টি গভীর হবে আর আমরা একে গুরুত্বসহকারে নিতে পারবো।

 

রাসূল  কে জানা ফরজ – বাধ্যতামূলক

 

রাসূল কে জানতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। এটা আমাদের প্রতি আলাহর নির্দেশ। কুরআনে প্রায় ৫০টির বেশি আয়াত রয়েছে যেগুলোতে কুরআন বা আল্লাহ আমাদেরকে নবী কে অনুসরণীয় আদর্শ নমুনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেনঃ তোমাদের জন্য অবশ্যই আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ – যারা কামনা করে আল্লাহ (এর সাক্ষাৎ) ও আখিরাতকে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে (কুরআন ৩৩:২১)

 

আমরা সিরাহ থেকে ধর্মীয় জ্ঞানার্জন করতে পারি, পারি ব্যবহার ও মূল্যবোধ শিখতে। সিরাহ থেকে আরো শিখতে পারি রাসূল কেমন নেতা ছিলেন, কেমন পিতা বা স্বামী ছিলেন। এমন কোনো দিক নেই যেখানে রাসূল ﷺ কে অনুসরণীয় আদর্শ নমুনা পাবো না।

 

রাসূলের অনুসরণ ও ভালোবাসাঃ সর্বোচ্চ সফলতা পথ

 

আল্লাহ যখন কোরআনে রাসূল ﷺ এর কথা উল্লেখ করেন, সেখানে অবশ্যই তিনি তাঁর জীবনী বা বায়োগ্রাফিকে রেফার করেন। একারণে দেখবেন সূরা   আহযাব ২১ নং আয়াতে আল্লাহ যখন বলতেছেনঃ “যে আল্লাহকে ও আখিরাতকে কামনা করে এবং আল্লাহকে অধিক পরিমাণ স্মরণ করে তাঁর জন্য অবশ্যই রাসূল এর মধ্যেই উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে চিরন্তন” – আয়াতের দিত্বীয়াংশে আল্লাহর সাক্ষাত ও সন্তুষ্টিকেই রাসূল ﷺ এর জীবনের আদর্শের সাথে সম্পৃক্ত করলেন। এ থেকেই বোঝা যায় আল্লাহ রাসূল ﷺ এর জীবনীকে এবং এর আদর্শকে কত বিশাল গুরুত্ব দিলেন যে আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাঁর সাক্ষাত ও আখিরাতের মুক্তি এই জীবনীর আদর্শের মাঝেই নিহিত, এটি চিরন্তন আদর্শ, এটি বহমান আদর্শের পূর্ণ নমুনা। এ কারণেই এখানে ভাষাতাত্বিক গুরুত্ব রয়েছে। লাম, লাকাদ, ফি এমার্জ, একই জুতা,। একারণে রাসূল ﷺ এর জীবনী থেকে প্রত্যেকটা লেভেলে আদর্শ নিতে হলে অবশ্যই অবশ্যই বিস্তারিত জীবনী পড়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। প্রত্যেকটা লেভেলে আদর্শ নিতে হলে অবশ্যই প্রত্যেকটা লেভেলের আদর্শ জানতে হবে এবং এটি বিস্তারতি পাঠ ব্যতীত কখনই সম্ভব।

 

“আল্লাহর রাসূলের জীবনীতে” উত্তম আদর্শ। রাসূল ﷺ এর জীবনী মানে তো কুরআন নয়, বা হাদীসও নয়। কুরআন মানে তো আল্লাহর বাণী; এটি রাসূলের বা কারো জীবনী নয়। আর হাদীসও তো ‘জীবনী’ নয়; সেগুলো বর্ণনার সংকলনমাত্র ও জীবনের খন্ড খন্ড চিত্র। আর প্রত্যেকটা হাদীসের কিতাবগুলোর সকল বর্ণনাও যদি আলাদা আলাদাভাবে একত্রিত করেন তবুও ধারাবাহিক ও পূর্ণাঙ্গ বায়োগ্রাফি বা জীবনী পাবেন না। আর আল্লাহ রাসূলের জীবনীকেই উল্লেখ করলেন এবং এও বলে দিলেন যে তোমাদের যেই এই জীবনের যেই সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য, আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাঁর সাক্ষাৎ, আখিরাতে ভালো অবস্থানে যাওয়া—এসব কিছুর নমুনা বা উত্তম আদর্শের জন্য আমার রাসূলের জীবনীতে যাও, তাঁর বায়োগ্রাফিতে যাও, তাঁর জীবনীতেই রয়েছে সব কিছুর প্র্যাক্টিকাল বা বাস্তবিক নির্দেশনা।

 

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরো বলেনঃ বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমার অনুসরণ করো- আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন ও সমস্ত পাপকে ক্ষমা করে দেবেন।আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময় (সূরা আলে-ইমরান- ৩১)

 

আর এই ভালোবাসার মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা ও ক্ষমা পাওয়ার জন্য রাসূল ﷺ কে জানার কোনো বিকল্প নেই, যা আমরা পাবো রাসুল ﷺ এর সিরাহতে।

 

রাসূল এর জীবন একটি মু’জিযা

 

সিরাহ অধ্যয়নের মাধ্যমে আরেকট অসম্ভব উপকারিতার দিক আমরা জানতে পারি যা অনেকেই ভাবি না আর সেটা হলো রাসূল ﷺ এর সমস্ত জীবন- শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত-ই পূর্ণাংগ মু’জিযা। তাঁর পূর্ণাংগ জীবন নির্দেশ করে যে তিনি একজন আল্লাহর রাসূল। তিনি এমন জায়গা থেকে এসেছেন, শিক্ষাসহ বা ব্যতীত, একটি বার্তা নিয়ে আসলেন, গভীরতাময়, একটি কিতাব, কুরআনের বাগ্মীতা – সবই এসেছে আল্লাহর পক্ষ থেকে। এসব দিকের সাথে ঐ সময়ে এতো ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং তাঁর জীবনকালেই আরবের কিছু ছিল না এমন এক সভ্যতাহীন মরুর বুকে সভ্যতার আলো জ্বালিয়ে দিলেন সমস্ত পৃথিবীর বুকে।

যেই আরব বাসীরা ছিল অজ্ঞ, ছিল না কোনো লাইব্রেরী, না কোনো সভ্যতা, না দুতলা বিল্ডিং আর না কোনো কিতাবাদি, এমনকি তারা লিখতে বা পড়তেও জানতো না।

 

এক অনুন্নত, অজ্ঞ ও বর্বর জাতির মধ্য থেকে তিনি আসলেন। তারা প্রকৃতই বর্বর ছিল। কিন্তু তাকিয়ে দেখুন তাঁর জীবদ্দশায় মাত্র ২০ বছরের ব্যাবধানে কি ঘটল? ৫০ বছরের ইসলাম প্রচারিত হয়ে লাগল আর ১০০ বছরের মাথায় সমস্ত বিশ্বকে শাসন করল। এটাই আল্লাহর ম’জিযা যা শুরু হয়েছিল রাসূল ﷺ এর জীবন দিয়ে।

 

এতো সমস্ত ক্ষমতা পেয়েও তিনি ছিলেন অনাড়ম্ব, সহজ-সরল জীবনের অধিকারী। সমস্ত সাহাবারা তাদের জীবনকে উৎসর্গ করতেন অথচ তিনি সেটা কাউকে নির্দেশও দিতেন না। কোনো ব্যক্তি ক্ষমতা, সম্পদ ও বিলাশিতার ছোঁয়ায় পড়াটা অসম্ভব কিন্তু তাঁর মাঝে ঐশী প্রভাবের কারণে বিশুদ্ধ চিত্তের অধিকারী ছিলেন আল্লাহর রাহমাতে।

 

আন্দালুসিয়ার বিখ্যাত ইসলামী স্কলার ইবনে হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ

 

“আল্লাহর কসম, মুহাম্মাদ  কে যদি তাঁর জীবন এবং যুগ- এর মু’জিযা ব্যতীত অন্য কোনো মুজিযা নাও দেওয়া হতো, তবুও তিনি যে আল্লাহর রাসূল এটা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট হতো। মুহাম্মাদ  যে আল্লাহর নবী এটা প্রমানের জন্য সিরাই শ্রেষ্ট ঈংগিতবাহী”।

 

তাঁর সময়, যুগ এবং সেই অজ্ঞ ও বর্বর জাতি থেকে তিনি এতটাই বৈপ্লবিক পরিবর্তন করলেন যিনি এসেছিলেন একটি ভদ্র পরিবার থেকে, মক্কার একজন রাখাল, তাঁর বার্তা কি ঘটিয়েছিল যে মাত্র ২০ বছরেই একটি জাতির সমস্ত কিছুই পরিবর্তিত করে দিয়েছিল; চিন্তা-চেতনা থেকে শুরু করে অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, যুদ্ধনীতি, খাদ্যাভাস, মূল্যবোধ, আচার-ব্যবহার, শিক্ষা, ভদ্রতা সবই।

 

কেউ ভাবতেও পারে নি যে একজন আরবের লোক পার্শিয়ান সভ্যতা ধ্বংস করে রোমান সভ্যতায় করাঘাত করবে, তাকেও উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বের দরবারে আসীন হবে।

 

কেউ ভবিষ্যতবাণী করতে পারেনি যে মক্কার একদল লোক, নতুন এক ধর্ম নিয়ে, যা রোমান বা পার্শিয়ার সমতুল্য হওয়ার কোনো যোগ্যতা-ই রাখে না। কিন্তু আল্লাহ রাহমাতের দরজা খুলে দিলেন, এই কম শিক্ষিত, সভ্যতাহীন এক ক্ষীণ সভ্য মানুষদেরকে বিজয় দিলেন এবং আরবের মরুভূমি থেকে উঠে আসল এক বিশ্বময় সভ্যতা। এটাই রাসূলের জীবনী, এটাই মু’জিযা।    রাসূলের সিরাহ পড়ে এটাই বুঝতে পারি যে আল্লাহর রাসূল ছিলেন আল্লাহর এক মু’জিযা।

 

নবুওয়াতের সত্যতার দলীল

 

রাসূল ﷺ এর নবুওয়াতের সত্যতা ও ইসলাম যে আল্লাহ সত্য দ্বীন এর সত্যতা ও বাস্তবতা রাসূল  ﷺ জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। পশ্চিমারা সেই প্রথম থেকেই ঠিক এই গোড়াতেই আঘাত করেছে। এভাবে কাফির মুশরিকদের মতই তাকে পশ্চিমারা চরিত্রহীন, লম্পট, নারীলোভী, যুদ্ধবাজ, ক্ষমতালোভী ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে এটা বুঝাতে চাচ্ছে যে যেই নবীর চরিত্র এরকম, সেই ধর্ম মানবতাময় হয় কীভাবে, সেটা সত্য ধর্ম হয় কীভাবে। অর্থাৎ পূরো দ্বীনের সত্যতা রাসূল ﷺ এর জীবনীর নিষ্কলুষতার উপর নির্ভর করছে। এজন্য ইসলামকে রক্ষা করার প্রথম ধাপ হয় রাসূলের জীবনীর নিষ্কলোষতাকে তুলে ধরা, তাকে ডিফেন্ড করা।

 

পৃথিবীর শ্রেষ্ট স্থান

আমরা সিরাহ অধ্যয়নের মাধ্যমে আরো পড়ি পৃথিবীর শ্রেষ্ট ব্যক্তি, সাহাবাদের শ্রেষ্ট যুগ এবং শ্রেষ্ট স্থান- মাক্কা ও মদিনা। এদুটি পৃথিবির শ্রেষ্টতম পবিত্র স্থান। রাসূলের সিরাহ-ই এই দুটি স্থানকে মর্যাদায় উন্নিত করেছে। মক্কা পবিত্র ভূমি ছিল কিন্তু সেটা কয়জনে জানতো? কে এর পরিচর্যা করেছে? কয়জনে এটা বিশ্বাস করতো? – যতদিন না রাসূল ﷺ  আসলেন। আর মদিনাকে নবীর শহর বলে কে পবিত্র করলো? কে এতো বিখ্যাত করল?

 

রাসূল  ﷺ  বললেনঃ আমি আজকে মদিনাকে পবিত্র করলাম যেরুপ ইব্রাহীম (আলাইহিস সালাম) মক্কাকে পবিত্র করেছিলেন, আল্লাহর অনুমতিতে।

 

বাস্তবিক মানব ও আদর্শ

 

আপনি যখন কিছু ফ্যাক্ট পড়েন তখন  যেন কিছু তথ্যের সমষ্টি দেখতেছেন। আবার যখন ধারাবাহিক আকারে ঘটনাগুলো পড়েন তখন মনে হয় রুপকথা পড়তেছেন। একারণে যখন হাদীসগুলো বিচ্ছিন্ন আকারে পড়বেন একেকটা টপিক আকারে, সেগুলো খুবই টেকনিক্যাল ইস্যু হয়ে যায়। অথচ আমাদের দরকার ছিল একজন ‘মানুষ’ এর জীবনী থেকে শিক্ষা নেওয়া, কোনো টেকনিক্যাল জটিল বিষয় নয়; কারণ টেকনিক্যাল বিষয় থেকে শিক্ষা সব সময়ই সাধারণের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমাদের সামনে রাসূল ﷺ এর জীবনীকে যখন এমন আকারে তুলে ধরা হয় যেমন ‘অতি মানব’ বা ‘সুপারম্যান’ বা লিজেন্ডারি টাইপের কিছু…তখন আমাদের জীবনের সাথে এই ‘অতি মানব বা সুপারম্যান’ বা লিজেন্ডারি অতি মানব এর কোনো সম্পর্ক থাকে না। কারণ আমরা হলাম সাধারণ মানুষ আর উনি হলেন ‘অতি’ ধরণের কিছু যা আমাদের হওয়া সম্ভব নয় বা আমাদের ঐ গুণগুলো আনা সম্ভব নয়। একারণে এই ‘অতি মানব বা সুপারম্যানের কাহিনী শুনে আমরা হাত তালি দেই ঠিকই, প্রশংসা করি ঠিকই কিন্তু দিন শেষে ‘অতি মানব বা সুপারম্যান’ টাইপের কিছু হওয়ার কারণে কিছু নেওয়ার থাকে না। একারণে আমাদেরকে রাসূল ﷺ কে ‘মানবিক’(Humanize) করা দরকার; শিক্ষা নেওয়ার জন্য। আমাদেরকে বুঝতে হবে তিনি একজন মানুষ ছিলেন, তাঁর পরিবার ছিল, তাঁর দুংখ-কষ্ট ছিল, তিনি হাসি-খুশিও থাকতেন। এইসব মানবিক দিকগুলো আনতে পারলেই আমরাও এসব জীবনীর ভেতর থেকে আদর্শ নিতে পারবো।

 

হেদায়তেঃ হাদীসের একাডেমিক জটিলতা ও সিরাহর সহজতা

 

আরেকটি বিষয় হল হাদীস নিয়ে। হাদীস একটি টেকনিক্যাল ইস্যু। এ থেকে মুহাদ্দিস এবং ফুকাহাগণ শিক্ষা আনেন। তবে হাদীস যেহেতু আলাদা আলাদা এবং বিষয়ভিত্তিক প্রাসঙ্গিক আকারে আসে এবং এভাবে আলাদা আলাদা শিক্ষা, রুলিংস আনা হয়, একারণে এর হাদীসের বর্ণনাগুলো ‘সার্বিক বর্ণনা’(Overall Narrative)থাকে না । একারণে অনেক সময় রাসূল ﷺ কে ‘মানবিক’তা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। একারণে হাদীসের প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে রুলিংস এর ক্ষেত্রে কিন্তু এটি সিরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন অধ্যয়ন করা মানে রাসূল ﷺ এর ‘মানবিক’তা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে যা সমস্যার একটি শুরুও হয়।

 

বাস্তবায়নযোগ্য শিক্ষা উদঘাটন ও আমাদের অদূরদর্শিতা

 

সিরাহ পাঠের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো এ থেকে শিক্ষা বের করা, রাসূল সা এর জীবনীকে প্রাসংগকি করা, আমাদের সমকালীন জীবনে প্রায়োগিক করে তুলা। এর মানে দুটি জিনিস ভালোভাবে আসে। এক- আমরা কীভাবে রাসূল ﷺ এর জীবনী পড়বো এবং এ থেকে কি শিক্ষা নেবো, আমাদের জীবনের সাথে প্রাসঙ্গিকতা কোথায়। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো রাসূল ﷺ এর জীবনের মাক্কী জীবন ছিল ১৩ বছর আর মাদানী জীবন ছিল ১০ বছর কিন্তু সিরাহর কোনো বই পড়তে গেলে দেখবেন এই ১৩ বছরের বর্ণনা করা হয়েছে ৫০-৬০ পৃষ্টাতে আর ১০ বছরের বর্ণনা করা হয়েছে ২০০-৪০০ পৃষ্টাতে!!! এটা কি করে হলো? কয়েকটি কারণ থাকতে পারে।

 

মাক্কী জীবনের চাইতে মাদানী জীবনে মুসলিম বেশি ছিল এবং একারণে সেখানে ইসলামের প্রয়োগও বেশি হয়েছে। মাদানী জীবন ছিল অনেকটা খোলা, প্রকাশ্য আর মক্কার প্রায় ৩ বছর ছিল গোপনে। মাসজিদুন নাবাবীও ছিল চর্চার একটি বড় কেন্দ্র। মাদানী যুগে সকল যুদ্ধ ছিল মাদানী যুগে, এগুলোর বর্ণনা, এসকল যুদ্ধের সাথে জীবনের অনেকটা সময়ই জড়িয়ে আছে।

 

কিন্তু বাস্তবতা হলো মাক্কার জীবনেও অনেক ঘটনা রয়েছে। কিন্তু কম আসার কারণ হলো মাদানী জীবন ছিল বাস্তবিক প্রয়োগের সময় আর এর জন্য এখান থেকে হাদীসের বর্ণনার ধারাবাহিকতাও বেশি এসেছে এবং সিরাহর বর্ণনাও বেশি এসেছে। কিন্তু মাক্কায় যেহেতু শরীয়াহর বাস্তবিক প্রয়োগ ছিল না এবং হাদীসও কম এসেছে, তাই মাক্কী জীবনের অসংখ শিক্ষা থেকে আমরা নিজেরাই বঞ্চিত হয়েছি। অথচ আমাদের জানা দরকার ছিল হাদীস এবং সিরাহর দুটোর দুই প্রায়োগিক শিক্ষণীয় দিক রয়েছে। একারণে মাক্কী জীবন বিস্তারিত জানা ও শিক্ষা আনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা সবাই কম-বেশি রাসূল সা যেভাবে গিয়েছেন জীবনের ধাপে, ঠিক সেভাবেই যাই আর এসব ধাপে আদর্শের শিক্ষাহীনতা ও অনুসরণীয় উত্তম আদর্শ না পাওয়া মানে পা পিছলে পথভ্রষ্টতাময় গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

সামগ্রিক জীবনের প্রাসঙ্গিক দৃষ্টপট

 

আমাদের বাস্তবিক জীবনে চাতুর্মুখিক ঘটনায় জড়িয়ে পড়ি। কিন্তু সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বের আরব মরুভূমির একজন মানুষের জীবন আমাদের এসব সমস্যার সমাধান দেবে কীভাবে? কিন্তু বাস্তবতা হলো আমরা যখন রাসূল ﷺ এর জীবনীকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করবো, তখন উপলব্ধি করতে পারবো যে তাঁর জীবনে আমাদের জীবনে আসা ছোট্ট থেকে শুরু করে যত বড় ঘটনাই আসুক না কেন, তিনি এগুলোর আল্টিমেট বিষয় পাড়ি দিয়ে গেছেন। দরকার কেবল গভীরভাবে সিরাহকে উপলব্ধি করা। সুতরাং ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, সাংগঠনিক, আন্দোলনগত, যুদ্ধ-জিহাদ, বিনিময়, আচার-ব্যবহার সকল দিকের সমস্যার সমাধান, সুন্দরতম পন্থা, সুন্দরতম ফল সবই উপস্থিত পাবো রাসূল ﷺ এর জীবনীর গভীর উপলব্ধিতে। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ২০০ বছর যেহেতু বড় ধরণের কোনো ধাক্কা খায়নি, তাই এই ইস্যুতে রাসূল ﷺ এর জীবনীকে নতুন আঙ্গিকে সমকালীন প্রাসঙ্গিক হিসেবে তুলে আনার প্রয়োজনও বোধ করা হয়নি এবং এই ভুল রয়ে গিয়েছিল গত শতাব্দির অনেকটা বছর জুড়ে।

 

আধ্যাত্বিক সমস্যা ও হাদীস অস্বীকার

সিরাহ উপলব্ধির আরেকটি দিক হলো হাদীসের বিশুদ্ধতা নিরুপন। হাদীসের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা দেখা দিয়েছে যে হাদীসগুলো উপযুক্ত অবস্থায় এসেছে কিনা। এগুলোর একাডেমিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে ট্যাকল দেওয়া হয়েছে অবশ্যই। রিজাল শাস্ত্র একটি উল্লেখযোগ্য দিক। কুরআনে যেখানে বলা হচ্ছে – “তোমাদের রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ করো আর যা থেকে বিরত রাখে তা থেকে বিরত থাকো”- সূরা হাশর-৭। এ থেকে বোঝা যায় কুরআন যেরুপ ও যেই সাহাবাদের বর্ণনার মধ্য দিয়ে আসছে ঠিক একই বর্ণনার ধারাবাহিকতা দিয়েই রাসূল ﷺ এর হাদীসগুলোও আসছে। এই একাডেমিক বর্ণনা অবশ্যই ঠিক আছে। কিন্তু মূল কথা হলো হাদীস অস্বীকারের বিষয়টা আধ্যাত্বিক সমস্যার কারণে হয়েছে, একাডেমিক কারণে শুরু হয়নি।

 

এই আধ্যাত্বিক সমস্যা কী?

 

আমাদেরকে বলা হয়েছে রাসূল ﷺ কে ভালোবাসতে(সূরা আলে-ইমরান-৩১)। কিন্তু এই ভালোবাসা মানে কী?

 

যা রাসূল ﷺ কে আনুগত্য করতে বলে, তাকে গ্রহণ করতে বলে, যা তাঁর জীবনীকে পড়তে বলে, তাকে অনুসরণ করতে বলে — এগুলোই তাঁর জন্য ভালোবাসা।

 

আপনি রাসূল ﷺ কে ভালবাসতে পারবেন না যখন আপনি তাকে চেনেনই না, জানেন না তাঁর জীবনী, তিনি কেমন ছিলেন, কীভাবে জীবন অতিবাহিত করেছেন। একজন ব্যক্তি পরিচিত হলেই না তাকে ভালোবাসার প্রশ্ন আসে। পরিচিতির সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক। ভালোবাসার সম্পর্কগত মনস্তত্ব এভাবেই কাজ করে। একারণেই সিরাহর উপলব্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এভাবে তাঁর জীবনের পূর্ণ ধারাবাহিক পরিচিত উন্নয়ন হতে হতেই ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠবে। এভাবে পূর্ণ জীবনের সাথে ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠলে হাদিসের ক্ষেত্রেও কোনো সমস্যা থাকবে না সেগুলো বিচ্ছিন্নতা আকারে পড়ার জন্য।

 

হাদীস অস্বীকার করার কারণ ধারাবাহিক আকারে যখন সিরাহ না পড়া হয়, অনুপলব্ধি থাকে, তখন বিচ্ছিন্ন হাদীসের সাথে জীবনের প্রাসঙ্গিকতা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে এবং এভাবে শত শত প্রশ্ন চলে আসে এবং হাদীস অস্বীকার করে থাকে।

 

হাদীসের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতা, হাদীস শাস্ত্রের জটিলতা, নাযিলের প্রাসঙ্গিকতা ইত্যাদি না জানার কারণে একটি বা দুইটি হাদীস বা একটা টপিকের হাদীস জানার কারণেও জীবনের সাথে ধারাবাহিক প্রাসঙ্গিকতা না থাকার কারণে রাসূল ﷺ এর জীবনের সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠে না এবং বিপরীতে হাদীস অস্বীকার করার নমুনা আসে। বিপরীতে যখন সিরাহ পড়বেন তখন সিরাহতে রাসূল ﷺ এর ক্ষেত্রে যেহেতু কোনো জটিলতা নেই, ঘটনার ধারাবাহিকতা বিদ্যমান, প্রসঙ্গের সাথে ঘটনাগুলো বর্ণিত, জীবনের প্রত্যেকটা অংশ এর পরের অংশের সাথে ধারাবাহিক ঐক্য বজায় রেখে চলেছে…এবং এভাবে বোঝার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা থাকে না, এভাবে ভালবাসার ক্ষেত্রেও কোনোরুপ সমস্যা হয় না আর শিক্ষাগুলোও নেওয়া যায়। একারণে হাদীস অস্বীকারকারীরা মূলত কোরআনের নির্দেশ অনুসারে রাসূল ﷺ এর জীবনী পাঠ করেনি আর তাই কুরআন ও হাদীস দুটো ক্ষেত্রেই তাদের সমস্যা হয়। কারণ রাসূলের জীবনী ছাড়া উত্তম আদর্শের নমুনা কোথায় পাবো? অথচ আল্লাহ বলেছেন তাঁর জীবনেই উত্তম আদর্শ নমুন রয়েছে এববং আল্লাহ সেখানে কত তাকিদ দিয়েছেন শব্দের মাঝে।

 

ইসলামের বাস্তব প্রয়োগ ও উপলব্ধির শ্রেষ্ট পাঠ

 

রাসূল ﷺ এর জীবনী কুরআন উপলব্ধির উত্তম সহায়ক মাধ্যম। যেকোনো জটিল টেকনিক্যাল বস্তুর সাথে একটি প্র্যাক্টিক্যাল মান্যুয়াল থাকে। এটিই কুরআনের সাথে রাসূল ﷺ এর জীবনের প্র্যাক্টিকাল মান্যুয়াল। একারণেই মা আয়েশা(রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) বলতেনঃ তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন। অর্থাৎ বাস্তবিক উদাহরণ ও উত্তম আদর্শের নমুনা বা মান্যয়াল ছিল তিনি এবং সাহাবারা ও তাবেয়ীরা এভাবেই বুঝতেন। গত কয়েকশত শতাব্দীর যদি বড় ধরনের কোনো ধংসাত্বক বিষয় থাকে তাহলো দ্বীন থেকে দূরে সরে যাওয়া। বিদায় হজ্জ্বে রাসূল ﷺ বলেছিলেনঃ…তোমরা কষ্মিনকালেও পথভ্রষ্ট হবে না যদি এই দুটি জিনিসকে দাত দিয়ে শক্তভাবে আকড়ে ধরোঃ তাহলো কিতাবুল্লাহ ও তাঁর নবীর সুন্নাত”। এটাই সিরাহর উপলব্ধি যা কুরআন উপলব্ধির প্র্যাক্টিকাল মাধ্যম। এখানেও আশ্চর্য বিষয় হলো ‘নবীর হাদীস’ বলা হয়নি, বলা হয়েছে ‘নবীর সুন্নাত’। আর এই সুন্নাহ কেবল হাদীস থেকে পাবেন না, কারণ সেগুলো বর্ণনামাত্র। এই সুন্নাহ পেতে হলে হাদীসের সাথে রাসূল ﷺ এর বাস্তবিক জীবনীর ঘটনাপ্রবাহগুলো অবশ্যই নিতে হবে। কারণ জীবনের ঘটনাপ্রবাহ সুন্নাহ মোতাবেক চলেছে এবং এগুলো ধারাবাহিক ও পূর্ণাঙ্গরুপে।

 

 পূর্ণাংগ অনুসরণীয় আদর্শের চূড়ান্ত রুপ

 

রাসূল ﷺ এর হাদীসগুলো যখন আলাদা আলাদা আকারে পড়া হয়, তখন্ন আলাদা আলাদা কিছু ফিকহী রুলিংস বা নিয়ম-কানুন আসে। এগুলো প্রত্যকের জন্য প্রত্যেক অবস্থায় প্রযোজ্য নাও হতে পারে বা কেউ নাও খুঁজতে পারে। কিন্তু আপনি যখন ধারাবাহিকভাবে তাঁর জীবনী পড়বেন, তখন তাঁর জীবনের ধারাবাহিকতা অনুসারে প্রত্যকেই প্রত্যকের জীবনের সকল অবস্থায়ই সব ধরণের হেদায়েত পাচ্ছে!! এমন কেউ থাকছে না যিনি রাসূল ﷺ এর জীবনীকে অপ্রাসঙ্গিক, অনর্থক বা তার জীবনের সাথে বাস্তবতা বিবর্জিত মনে করছে। বরং প্রত্যকেই রাসূল ﷺ এর জীবনী থেকে শিক্ষা নিতে পারছে, তার জীবনের সমস্যার সমাধানে প্রাসঙ্গিক ও অর্থবহ মনে করছে এবং এভাবে সিরাহকে জীবন্তরুপে পাচ্ছে। এভাবে একজন যুবক পাবে তার যৌবন বয়স যাপনের সকল দিধা-দ্বন্দের উত্তর, একজন স্বামী পাবে তার বিবাহিত জীবনের সুখের চাবিকাঠি, সকল বিবাহিত জীবনের সমস্যার সমাধান, একজন শাসক পাবে কীভাবে সকলের কল্যাণকামিতা দেখাশুনা করতে হয়, একজন দাঈ পাবে কীভাবে দাওয়াত দিতে হয়, একজন রাষ্ট্রনায়ক পাবে কীভাবে সকলের অধিকার নিশ্চিত করতে হয়, একজন ব্যক্তি পাবে কীভাবে সৎ হতে হয়, একটি পরিবার দিশা পাবে কীভাবে পরিবারকে তাকওয়ার উপর ভিত্তি করতে হয়, একটি রাষ্ট্র পাবে কীভাবে সুন্দরতম পন্থায় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয়। এভাবে সকলের হেদায়েতের দিশা পাবে সিরাহর গভীর উপলব্ধিতে এবং যা হবে সর্বসাধারণের জন্য প্রযোজ্য।

 

রাসূল ﷺ বলেছেনঃ নিশ্চয় আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। তার মানে তিনি তাঁর সমস্ত জীবনের মাধ্যমে বাস্তবিক সব শিক্ষাই দিয়ে গেছেন অথচ আমরা সেই শিক্ষাগুলো না নিলে কীভাবে নাজাত পাবো? জীবনের প্রত্যেকটা দিকে পথ নির্দেশনা পাবো কীভাবে?

 

রাসূল ﷺ এর পথ অনুসরণ করার জন্য। রাসূল সা এর চরিত্র ছিল সর্বাপেক্ষা পূর্ণতাসমৃদ্ধ। এজন্য আখিরাতের সাফল্য পেতে হলেই এই চারিত্রিক মাধূর্যের মাধ্যমেই নাজাতের পথ অনুসরণ করতে হবে।

 

সিরাহ আমাদেরকে রাসূল সা এর হেদায়েতপ্রাপ্ত জীবনের সাথে আমাদের ঈমান, আখলাক ও আদব ইত্যাদির সাথে অবিরত সংযুগ প্রতিষ্ঠিত করে। সিরাহ আমাদেরকে পিতা, স্বামী, নেতা, ন্যায়বিচারক, বন্ধু, শিক্ষাবিদ, দাঈ, ব্যবসায়ী, ভ্রমণকারী, যোদ্ধা, শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী- এসবের জীবন্ত ও শক্তিশালী আদর্শ নমুনার পথ দেখায়। প্রকৃতপক্ষে এটি আমাদের প্রাত্যহিক মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রেই অনুসরণীয় আদর্শ দেখায়। তাঁর জীবনের প্রত্যেকটা খুটি-নাটি বিস্তারিতই আমাদের কাছে সংরক্ষিত এবং এগুলো আমাদের সবারই অনুসরণের জন্য আদর্শ উদাহরণ।

 

সর্বশ্রেষ্ট যুগ

 

আমরা সিরাহ অধ্যয়নের মাধ্যমে সর্বশ্রেষ্ট যুগ ও সময়ের সাহাবাদেরকে দেখি যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন ‘আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট’

 

রাসূল ﷺ বলেছেন খাইরুল উম্মাতি কারনি, আমার উম্মাত-ই শ্রেষ্ট উম্মাহ, অর্থাৎ সাহাবারা। তিনি সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ ও পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের লোকদেরকে সাহাবা হিসেবে পেয়েছিলেন। এভাবে আমরা সিরাহ পড়তে গিয়ে সর্বশ্রেষ্ট মানুষদের শিক্ষাগুলো পড়ি – আবু বাকার, উমার, জুবায়ের, তালহা, সা’দ, মু’য়াজ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) এবং এই শ্রেষ্টদের জীবনী আমাদেরকে অনুপ্রেরণা দেয়, আমাদের ঈমানী শক্তিকে দৃঢ় করে – তাদের ধৈর্য, আত্মত্যাগ, অধ্যবসায়। এরা প্রত্যেকেই আমাদের অনুসরণীয় মডেল হিসেবে সম্মুখে থাকে।

 

জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রেই অনুসরণীয় আদর্শ

 

মানব ইতিহাসে কারো জীবনী এত বিস্তারিত, সুক্ষাতিসুক্ষ্ণ, জীবনের প্রত্যকেটি দিক প্রামাণিকভাবে লেখা হয়নি। ইমাম আত-তিরমীযী (রাহিমাহুল্লাহ) এর শামায়েলে তিরমীযী- তাঁর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর শোয়ার ধরণ, তাঁর শরীরের রঙ, কপালের বর্ণনা, চোখের বর্ণনা, চুলের পরিপাটি, হাটার ধরণ, খাওয়ার পদ্ধতি, কথার টুন, অন্যের সাথে আচার-আচরণ থেকে শুরু করে পারিবারিক, আত্মীয়সজনের সাথে চলাফেরা, বন্ধু, স্ত্রী, সাহাবী, সবার সাথে কেমন চলতেন, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সব দিক—-এভাবে সকল দিক প্রামাণিকভাবে এতো সুক্ষাতিসুক্ষ্ণ রক্ষণাবেক্ষন ইতিহাসে জীবন্ত হয়ে আছে রাসূল ﷺ এর জীবনীতে। অথচ তিনি কোনো জীবনী নিজে লেখননি। আজকের দিনেও যাদের নিজেদের হাতে নিজেদের অটোবায়োগ্রাফি লিখেছেন, তাদের জীবনী পড়ে দেখেন দেখবেন কত কিছু মিস!!

 

একারণেই আল্লাহ বলেনঃ আমি আপনাকে অবশ্যই সমস্ত মানব জাতির জন্য প্রেরণ করেছি।

 

অন্য জায়গায় আল্লাহ রাসূল ﷺ এ ঘোষণা দিতেই বলে দিয়েছেঃ বলুন, আমি আল্লাহর রাসূল এবং আমাকে সবার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।

 

আরো বলেনঃ অবশ্যই আমি আপনাকে সমস্ত বিশ্বের জন্য রাহমাতস্বরুপ প্রেরণ করেছি।– রাসূলকে রাহমাতস্বরুপ, কুরআন বা হাদীসকে নয়। সুতরাং এই রাহমাতের স্বরুপ, বিশজনীনতা, উপকারিতা জানতে হলে অবশ্যই তাঁর জীবনী জানা আবশ্যক।

 

মুসলিম উম্মাহর পূনর্জাগরণের নির্ভুল মেথডলজি

 

মুসলিম বিশ্ব প্রায় কয়েকশ বছর ধরে পতনের মাঝে নিমজ্জিত। এখন ইসলামি শিক্ষার উপকরণ নেটে প্রচূর পরিমাণে পাওয়া যায়। সূরা ইয়াসিনে আল্লাহ বলেছেনঃ “কুরআন পাঠানো হয়েছে পূর্বে যাদেরকে পাঠানো হয়েছিল তাদেরকে যেন সতর্ক করা হয়”। কারণ তারা অসতর্ক ছিল, তাদের চিন্তা-ভাবনা ছিল না। কিন্তু এখন আমরা এই সতর্কতাকে কাঠিয়ে উন্মুক্ত হয়ে যদি সফলতার দিকে ধাবিত হতে চাই। আমাদের দরকার গভীর পরাশোনা ও তারবিয়্যাহ। তাঁরবিয়্যার দুটি জিনিসের প্রতি খুবই গুরুত্ব দেওয়া দরকার।। এক- কুরআনের শিক্ষা। এখানে প্রাথমিকভাবে দরকার ঈমানের বিষয়াবলী বোঝা, ফরজ বিষয়গুলো ভালো মত পালন করা, তাওবাহ, আখলাক ইত্যাদি ব্যাসিক বিষয়াবলীর উপলব্ধি এবং জীবনে প্রয়োগ। দুই- তারবিয়্যার দিত্বীয় দিক হলো রাসূল ﷺ এর জীবনী অধ্যয়ন যা একজন ব্যক্তিকে রাসূল ﷺ এর সাথে সম্পৃক্ত করবে, যিনি শুণ্য থেকে শুরু করে জীবদ্দশাতেই কি পূর্ণতার রুপকে সাজিয়েছিলেন আল্লাহর রাহমাতে।

 

রাসূল ﷺ এর জীবনী ইসলামী আন্দোলনের মেথডলিজিক্যাল পদ্ধতি। তিনি ধারাবাহিকভাবে স্টেজ বাই স্টেজ গিয়েছে জীবনের মধ্য দিয়ে। তিনি শূণ্য থেকে শুরু করে তাঁর বেঁচে থাকাকালীন সময়েই দেখে গেছেন তাওহীদি বিজয় পতাকা। এগুলো অবশ্যই আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী-ই হয়েছে; বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এই পরিকল্পনার ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই আবারো ইসলামের সফলতা আসবে। আমাদেরকেও ঐ পদ্ধতিতেই আগাতে হবে। সুতরাং তিনি কোন কোন ধাপে এগিয়েছেন এবং দাওয়াতের পদ্ধতি কীভাবে এগিয়েছে সেগুলো দেখা দরকার।

 

বিভিন্ন ইসলামী গোষ্টি ইসলামী পূনর্জাগরণের ব্যস্ত কিন্তু তাদের মেথডলজি ভিন্ন ভিন্ন  ও নিজদের তৈরি। আমরা রাসূল ﷺ এর মেথডলজি-ই অনুসরণ করি না কেন যিনি ছিলেন শ্রেষ্ট মানুষ, যিনি একদম শুণ্য শুরু করে পুরো এক ইসলামী সভ্যতার বিজয়ের বাস্তব ধারক হিসেবে সফলতা দেখিয়ে দিয়ে গেছেন আল্লাহর মেথডলজি দিয়ে।

 

রাসূল ﷺ যেই ধারায় বা পর্যায়ক্রমে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন সেগুলো আল্লাহর ওয়াহীভিত্তিক ছিল, কিয়াকশনারী ছিল না। গোপন দাওয়াহ থেকে উন্মুক্ত দাওয়াহ এবং শেষে জিহাদ। এই ধারা বিচ্ছিন্ন ও রিয়াকশনারী বা পরিস্থিতির আলোকে নয় বরং আল্লাহর প্ল্যান-পদ্ধতিতেই ছিল।

 

আল্লামা রশিদ রিদা (Rasheed Rida) বলেনঃ

 

“এগুলো যদি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য নাই হতো, তবে কেবল শাব্দিক কথার নির্দেশনা যথেষ্ট হতো না। কারণ সিরাহ-ই তাদেরকে শিখিয়েছিল কীভাবে কুরআনের মাধ্যমে সঠিক পথ পেতে হবে এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থায় চলতে হবে। সুতরাং আমাদের কাছে শাব্দিক শিক্ষার কুরআন ও সুন্নাহ রয়েছে, কিন্তু এসব কথার শিক্ষা আমরা কিভাবে প্রয়োগ করবো? রাসূল ও সাহাবাদের জীবনের বাস্তব প্রয়োগ দেখে। কেননা, তারা আল্লাহর কথার নির্দেশনাগুলোকেই বাস্তবে কাজে পরিণত করেছিল। আমরা দেখতে পাই যে অন্যান্য নবী-রাসূলদের জীবনী হারিয়ে গেছে কিন্তু আমরা জানতে পারি কুরআন কীভাবে প্রয়োগ হয়েছিল, আমরা আরো জানতে পারি কীভাবে রাসূলের সুন্নাহ বাস্তবায়িত ও প্রয়োগ হয়েছিল”।       

 

মানুষ প্রশ্ন করে আমরা কীভাবে উম্মাহর সম্মান ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনবো? – আমরা বলি সিরাহ-তে সেই প্রশ্নের পূর্ণাংগ সমাধান আছে।

 

ইসলামের শ্রেষ্ট ইতিহাস

 

মুহাম্মাদ সা এর জীবনী-ই হলো ইসলামের শ্রেষ্ট ইতিহাস। আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি দিকের সমস্যা ও সমাধান রয়েছে এই জীবনীতে। আমরা কেবল জীবনী পড়তেছি না, আমরা পড়তেছি ইতিহাস এবং আমাদের জীবনের জন্য বাস্তব শিক্ষা। ইতিহাসের প্রয়োজনীয়তা হলো; যে যত বেশি পেছনে দেখতে পারে, সে ততো বেশি সামনে দেখতে পারে। কেননা ইতিহাসের চিরন্তন শিক্ষা নিয়ে আগানো আর ভুলগুলোকে সঠিকে রুপান্তরিত করার আয়না হিসেবে কাজ করে। এভাবে উন্নতির শিখরের দরজা আমাদের পূর্বেই বপিত হয়ে আছে রাসূলের জীবনীতে।

 

 

কুরআন উপলব্ধিতে সিরাহ অপরিহার্যতা

 

কুরআনের অনেক আয়াত স্বাধীনভাবে ব্যবহার হতে পারে (আকীদা ও আখিরাত)। কিন্তু যেসব বিষয়াবলী রাসূল ﷺ এর সাথে, ঐ সময়ের কোনো ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত, সেগুলো বোঝার জন্য অবশ্যই সিরাহ দরকার, নতুবা কুরআনের উপলব্ধিও সম্ভব নয়। কারণ মুহাম্মাদ ﷺ এর উপর, তাঁর ঘটনার সাথে বা প্রসংগেই তো নাযিল হয়েছে, তাহলে তাকে ছাড়া এসব আয়াতের উপলব্ধি কীভাবে সম্ভব? অর্থাৎ কুরআন যেহেতু রাসূল ﷺ এর উপর নাযিল হয়েছে এবং তিনিই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রসঙ্গ হয়েছেন, তাই তাঁর জীবনী না জানলে প্রসঙ্গহীনভাবে কুরআনের উপলব্ধি সম্ভব নয়। সূরা আহযাবের অনেক আয়াত আহযাবের যুদ্ধ নিয়ে, সূরা আলে-ইমরান রাসূল ﷺ এর সাথে খৃষ্টানদের সাথে আলোচনা। কিন্তু এগুলো বিস্তারিত কুরআনে পাওয়া যাবে না আর তাই সেগুলো বুঝতে সিরাহর কাছে যেতেই হবে। এ ছাড়া কুরআনে বিভিন্ন যায়গায় বিভিন্ন জিহাদের কথা এসেছে কিন্তু কোন আয়াতগুলো কোন জিহাদের প্রেক্ষাপটে সেগুলোর নাম নেই। এক্ষেত্রে অবশ্যই সিরাহ নিতেই হবে কুরআন উপলব্ধির জন্য।

 

সূরা ইনশিরাহতে বক্ষ বিদীর্ণ করার কথা এসেছে। অথচ এটি ছিল রাসূল ﷺ এর ৫ বছর বয়সের ঘটনা। অর্থাৎ আল্লাহ ৫ বছর বয়সের সিরাহকে উল্লেখ করলেন আর আমরা যদি সিরাহ নাই জানি, তবে সূরা বা আয়াতের শিক্ষাও বুঝতে পারবো না।

 

অথবা সূরা দুহা(আয়াত-৩)-তেও এসেছে “তোমার প্রতিপালক তোমাকে পরিত্যাগ করেনি আর তোমার প্রতি অসন্তুষ্টও হয়নি”।

 

সিরাহ অধ্যয়ন ব্যতীত এই আয়াত বুঝবেন না।  কখন এটি নাযিল হয়েছিল, কেন এটি নাযিল হয়েছিল,  নাযিলের প্রসঙ্গ কী ইত্যাদি।

 

কুরআনের যত জায়গায় নবী বা রাসূল শব্দ দিয়ে উল্লেখ করেছেন, সবগুলো জায়গায়ই আপনার সিরাহর ঐ অংশ জানা দরকার। একজন সুসংবাদদাতা হিসেবে উল্লেখ করলে আপনার সিরাহ থেকে জানা উচিৎ তিনি সুসংবাদদাতা হিসেবে কেমন ছিলেন। আল্লাহ যখন তাকে দাঈ হিসেবে উল্লেখ করছেন, তিনি কেমন দাঈ ছিলেন সেই প্র্যাক্টিকাল দিক জানতে সিরাহ পড়তেই হবে। কেমন আদর্শ স্বামী বা পিতা ছিলেন সেটা সিরাহ থেকে জানতে হবে।

 

এভাবে কুরআনের সাথে সিরাহর অংঙ্গাংগিভাবে জড়িত।

 

আশার আলোঃ ঈমানী দৃঢ়তা

 

সিরাহ আমাদের আশার উৎস। এটা আমাদেরকে উজ্জীবিত করে, আশার মাধ্যমে আমাদেরকে  জাগ্রত করে।  সিরাহ অধ্যয়নের মাধ্যমে জানতে পারি আমাদের পূর্বে আমাদের চাইতে বেশি কষ্ট করে গেছেন অনেক ব্যক্তি কিন্তু সেই কষ্টসমূহের জায়গায়ও তারা সৎ পথে অটল থেকেছেন, হেদায়েতের চূড়ান্ত রুপ দেখিয়ে দিয়েছেন।  আল্লাহ কুরআনে নবীকে পূর্ববর্তী নবীদের সিরাহ বর্ণনার উদ্দেশ্যে বলেনঃ

 

“আমি তোমার কাছে ঐসব নবীদের মধ্য থেকে রাসূলদের বৃত্তান্ত বর্ণনা করি যাতে তোমার অন্তরকে ঐগুলো দ্বারা দৃঢ় করতে পারি। এর মাধ্যমে তোমার কাছে এসেছে সত্য আর মুমিনদের জন্য এসেছে শিক্ষণীয় বাণী ও উপদেশ” – সূরা হুদ-১২০

 

এজন্য আমরা পূর্ববর্তী নবী-রাসুল, আমাদের নবী ও সাহাবারা যেই সর্বোচ্চ লেভেলের কষ্ট থেকে দৃঢ়তা, সততা ও সাফল্যের পথের নির্দেশনা পেয়েছেন, সেখানে তাদের চাইতে খুবই কম কষ্টের মাঝেও আশার সঞ্চারণ ধ্বনি দেখতে পাই, দেখি অন্ধকারের মাঝে জোনাকির ঝিলিকের আলোকছটা যা আমাদেরকে ঈমানের দৃঢ়তায় ফিরতে সাহায্য করে, আলো দেখায় ভবিষ্যতের; সাফল্যের।

 

ইসলামিক আইডেন্টিটি

 

সারা বিশ্বে গ্লোবাল কালচার চলছে কিন্তু এর মাঝে যদি আমরা যদি রাসূল ﷺ এর আখলাকের আলোকে উন্নত কালচার তৈরি করতে না পারি তবে আমাদের আইডেন্টিটিই নষ্ট হবে আর আমরা বিপন্নতার মুখে পড়বো। কারণ কোনো উন্নত কালচার তাঁর চেয়ে নিম্ন কালচার বা নিষ্ক্রিয় কালচার ও আইডেন্টিটিকে থমকে যেতে বাধ্য করে এবং এভাবে হারিয়েও যাবে। আমরা নবীদের ইতিহাস ও শিক্ষা জানি না কিন্তু শার্লক হোমস বা ইংলিশ মুভির সবই বলে দিতে পারি। এভাবে আমাদের শিকড়কে হারিয়ে ফেলছি। এজন্য আমাদের নবীর সিরাহ পড়লে বুঝতে পারি কীভাবে সমস্ত জায়গায় তিনি ইসলামের আইডেন্টিটিকে সুন্দরতম আখলাকের দ্বারা তুলে ধরতেন। এজন্য আমাদের সিরাহ পড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

সিরাহর উৎস কী কী?

 

প্রায় সারে চৌদ্দশত বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু আমি সিরাহর সোর্স পাবো কোথা থেকে? কোথা থেকে সিরাহর অধ্যয়ন নেবো? সিরাহর প্রাথমিক সোর্স কোনগুলো? আমি কীভাবে জানবো কী ঘটেছিল রাসূল ﷺ  এর জীবনে?

 

উস্তাদ নুমান আলী খান বলেনঃ একজন ভালো মুসলিম হতে গেলে তিনটি জিনিসের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ জীবনের প্রাত্যহিক পরিকল্পনায়।

 

১। প্রাত্যহিক ইবাদাহর উন্নতি করা। রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে গিয়ে সালাত ঠিকমত আদায় করা, কুরআন মুখস্ত করা ইত্যাদি।

 

২। জ্ঞানার্জন করা। আপনি প্রচূর জ্ঞানার্জন করলেন কিন্তু ইবাদাহ করলেন না, আপনার জ্ঞানের কোনো উপকারিতা নেই। এর মাঝে কমপক্ষে প্রতি বছর একটি করে সিরাহ অধ্যয়ন করা এবং প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন সিরাহ অধ্যয়ন করা- এবং সিরাহ অধ্যয়নকে খুবই গুরুত্বসহকারে নিতে হবে। এভাবে সবগুলো সিরাহ পড়তেই থাকুন প্রতি বছর বারবার। কেননা রাসুলের সেই জীবনই আমাদের ভিশন, তিনি-ই আমাদের অনুপ্রেরণা। সুতরাং আমাদেরকে তাঁর কাছে বারবার ফিরে যেতে হবে। এটা জ্ঞানের অপরিহার্য অংশ। এটা আপনাকে জীবনের জন্য লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাবে, উপলব্ধির গভীরতা আনবে। জ্ঞানার্জনের আরেকটি ধারাবাহিক অপরিহার্য অংশ রাখুন কুরআনের জন্য। হতে পারে একটি সূরা এক বছরের জন্য রাখুন এবং একে গভীরভাবে বিভিন্ন তাফসির থেকে পড়তে থাকুন, সম্ভব হলে একই সাথে এক বছরে ঐ সূরাটি মুখস্ত করে ফেলুন। প্রাত্যহিক জীবনের জন্য কিছু কিছু দোয়া মুখস্ত করুন। জ্ঞানকে বাস্তবের রুপান্তরিত করুন।

 

৩। সেবামূলক কাজ করা। অন্যকে সাহায্য করা। এটি ইসলামের ব্যাপারেই যে করতে হবে তা নয়। কিন্তু এটি করতেই হবে। আরো ভালো হয় অমুসলিমদের সাথে কাজ করা যেন তারা বুঝতে পারে মুসলিমরা কতটা কেয়ারফুল। এতে তারাও ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করবে, জানবে, ইসলামের ছোঁয়ায় আসবে। এটি ম্যাচিউরিটি তৈরি করবে।

 

তাহলে চলুন সিরাহর কিছু সোর্স দেখি।

 

প্রথম উৎসঃ কুরআন

 

সিরাহর প্রথম সোর্স অনেকেই ইবনে ইসহাক বা ইবনে হিশাম বলে। আসলে সিরাহর প্রথম সোর্স হবে কুরআন। কারণ কুরআন তো রাসূলের সিরাহর সময় নাযিল হয়েছিল, তাঁর উপর নাযিল হয়েছিল, তাকে প্রসংগকে করে। কুরআনের বড় বড় ঘটনাগুলোই রাসূলকে কেন্দ্র করে, তাঁর সময়ে ঘটেছিল।

যেমন সূরা ইনশিরাহর ঘটনা তাঁর জীবনের ৫ বছর বয়সে ঘটেছিল যখন জিব্রাইল (আলাইহিস সালাম) প্রথম তাঁর নিকট এসেছিল।

 

এমনকি কুরআন তাঁর জন্মের পূর্বের কাহিনীও বর্ণনা করেছে। সূরা ফিল তাঁর উদাহরণ। অর্থাৎ আমরা দেখি কুরআন তাঁর জন্মের পূর্ব থেকে তাঁর জীবনের শেষ পর্যন্ত বলে দিচ্ছে যা সূরা মায়েদার ৩ নং আয়াতের অংশ বিশেষ – “আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম…”

 

কুরআন সিরাহর শ্রেষ্ট সোর্স হওয়ার কারণ অনেকগুলো। প্রথম হলো এটি আল্লাহর কথা এবং আল্লাহ-ই আমাদেরকে সব কিছু বলতেছেন। আরেকটি বিষয় হলো আল্লাহর কালামের অসাধারণ অনিন্দ বাগ্মীতা যা অন্যকিছুর তুলনায় অতুলনীয়।  আল্লাহ কত সুন্দরভাবে বদর, ওহুদ যুদ্ধের এবং সাহাবাদের হৃদয়ের অনুভূতির বর্ণনা দিলেন। কুরআনের অনন্যতা হলো যেখানে ঐতিহাসিকরা ঘটনার বাহ্যিক দিক তুলে ধরেন সেখানে আল্লাহ অভ্যন্তরীরণ ও অন্তরস্থা বিষয়াবলীকে ফুটিয়ে তুলেন।

 

কুরআনের ব্যাপারে একটি বিষয় হলো কুরআনে সিরাহ ধারাবাহিকভাবে আসেনি। কুরআনের সাজানি কুরআনের নিজস্ব স্টাইলে (‘তাফসীর তাদাব্বুরে কুরআন’ দেখুন- আল্লামা আমীন আহসান ইসলাহী), সিরাহর ধারাবাহিকতা অনুসারে নয়। আবার কুরআনে একটা ঘটনা বর্ণিত হয়েছে কিন্তু কোন বিষয়ের ঘটনা সেটার রেফারেন্স নেই।

এজন্য কুরআন বুঝতে সিরাহর অপরিহার্যতা অবশ্যই রয়েছে। এটা সিরাহর প্রথম সোর্স যার ভাষার বর্ণনাভঙ্গি অতুলনীয় এবং সর্বাপেক্ষা জ্ঞানসমৃদ্ধ।

 

দ্বিতীয় উৎসঃ হাদীস

 

সিরাহর দ্বিতীয় উৎস হাদীস। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেকটা হাদীস-ই কিন্তু সিরাহর একেকটা অংশ। হাদীস কি? রাসূলের কথা। রাসূলের কথা কি? কোনো ঘটনার সাথেই তো কথার সম্পৃক্ততা, তাই না? এভাবে প্রত্যেকটি ঘটনা-ই তো সিরাহ। এভাবে হাদীসগুলো সিরাহর এককটা অংশ হয়ে আছে।

 

কিন্তু হাদীসের ব্যাপারেও আরেকটি বিষয় হলো হাদীসও কুরআনের মত ধারাবাহিক আকারে নেই যদিও রেফারেন্স আছে পূর্ণাকারে। এর কারণ হলো হাদীসের সংকলন  মূলত সুন্নাহ ভিত্তিক হওয়ার কারণে বিষয়ভিত্তিক বা সনদগতভাবে সাহাবাভিত্তিক হয়েছে, ঘটনার ধারাবাহিকতা অনুসারে না হয়ে। আরেকটি দিক হলো হাদীসের ক্ষেত্রে একাডেমিক জটিলতা থাকার কারণে ঘটনার পূর্ণাংগতা আসেনি এবং একারণে ধারাবাহিকতাও রক্ষা হয়নি। কিন্তু বিশুদ্ধতার উৎস হিসেবে হাদীস অবশ্যই দ্বিতীয় উৎস হিসেবে দন্ডায়মান তাঁর মানের কারণে।

 

তৃতীয় উৎসঃ সিরাহর ক্লাসিকাল বই

 

সিরাহর বইগুলো মূলত লেখা হয় সিরাহকে কেন্দ্র করে। সাহাবাদের সন্তানগণ প্রথম সিরাহর বই লেখা শুরু করেন। চিন্তা করতে পারেন সাহাবারা যারা নিজের চোখে রাসূল ﷺ কে দেখেছেন, চলেছে, জীবনের কথা ঘটনা ছিল তাদের সাথে এবং এরাই তাদের সন্তানদের এরকম জীবনের সেই শ্রেষ্ট মূহুর্তগুলোকে বর্ণনা করেছেন এবং তারা এগুলোকে লিপিবদ্ধ করেছেন।

 

উরওয়াঃ যিনি ছিলেন জুবায়ের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর) ছেলে। তিনি একজন সাহাবীর সন্তান। তিনি রাসূলের ﷺ এর জন্মের পর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। রাসূল ﷺ এর স্ত্রী আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন তাঁর আন্টি এবং একারণে আন্টির কাছে তাঁর মাহরাম হওয়ার কারণে সম্পূর্ণ প্রবেশাধিকার ছিল। একারণে  আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) এর বর্ণনাগুলো উরওয়া থেকে বিস্তারিত আমরা পাই। এভাবে উরওয়া সিরাহর একটা গ্রন্থ লিখেছিলেন।

 

আব্বানঃ ইনি ছিলেন উসমান(রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এর ছেলে। তিনি ১০৫ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনিও সিরাহর উপর বই লিখেছিলেন।

 

ইবনে শিহাব যুহরীঃ তিনি ১২৯ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনিও সিরাহর উপর একটা গবেষণামূলক বই রচনা করেছিলেন।

 

এসব বই এখন আর অস্তিত্বে নেই।

 

সিরাতে ইবনে ইসহাকঃ  সিরাতের উপর সর্বাপেক্ষা বিস্তারিত বই হিসেবে এটিই নির্ভরযোগ্য। তিনি ৮৫ হিজরীতে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মদিনাতেই বসবাস করতেন। এই সেই মদিনা যেখানে রাসূল ﷺ বসবাস করতেন, এখানেই মৃত্যুবরণ করেছেন, যেখানে সাহাবাদের ছেলে-মেয়ে বড় হয়েছে। ইবনে ইসহাক এখানেই সাহাবাদের বংশধরদের আশে পাশে থেকেই বর হয়েছে। বিশেষত ৮৫ হিজরী অনেক কাছের সময়। কারণ সাহাবারা ১০০ বা ১১০ হিজরী পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।

 

সুতরাং ইবনে ইসহাক সাহাবাদের সন্তানদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, আর হতে পারে কোনো সাহাবার সাথেও। কিন্তু তিনি যা শুনতেন সবই লিখে রাখতেন কারণ সিরাহর প্রতি তাঁর দারুণ আগ্রহবোধ ছিল। তিনি সিরাহকে ধারাবাহিক অনুসারের সাজাতে শুরু করলেন যেখানে পূর্ববর্তী সিরাহগুলো ক্রমানুসারে সাজানো ছিল না।

 

তিনি বলতেন কোনটা মক্কায় ঘটেছিল, কোনটা মদিনায় বা কোনটা মক্কার মধ্য সময়ে বা কোনটা হিজরাতের পর। এমনকি তিনি এভাবে সংকলনের সময় অন্যান্য জায়গায় যেসব সাহাবাদের সন্তানগন ছিলেন, তাদের কাছেও ভ্রমণ করেছে যেমন বসরা, কুফা ইত্যাদি। এভাবে তিনি এক মস্ত বড় সিরাহর সংকলন করলেন। তাঁর প্রাইমারি সোর্স ছিল আব্দল্লাহ ইবনে মাসউদ মদিনায় ছিলেন এবং সেখানেও তিনি ভ্রমণ করে সব নিয়েছিলেন।

 

সিরাতে ইবনে ইসহাকের অন্যতম সেরা যে দিকটি ছিল সেটা হলো তাঁর সিরাহ সংকলনের সাথে বর্ণনার ধারাবাহিকতা ছিল যাকে সনদ (chain of narrators) বলা হয়। ইসনাদের সৃষ্টি-ই ইসলামের ইতিহাস থেকে। এটা অন্য কোথাও নেই। এই ইসনাদের কারণে সিরাতের প্রত্যেকটা ঘটনাই রাসূল পর্যন্ত বর্ণনাকারী রয়েছেন!! অর্থাৎ সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের মাধ্যমেই তাঁর সিরাহ সংকলিত হয়েছিল। কারণ আমরা উপকথা বা কুসংস্কারের উপর নির্ভর করি না।

 

এভাবে তিনি সিরাহর উপর প্রায় ১০-১৫ খন্ডের মত বিরাট বই লিখেন। ইবনে ইসহাক ১৫০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন যা খুবই কাছাকাছি সময়।

 

এছাড়া সিরাহ নিয়ে আধুনিককালেও অনেক কাজ হয়েছে যা এখানে উল্লেখ করা হলো না। আপনারা সিরাহর উদ্দেশ্য পড়তে গিয়ে স্কলার ও বিশেষজ্ঞদের নাম দেখেছেন।

 

সিরাতে ইবনে হিশামঃ  ইবনে ইসহাক যেই বই লিখেছিলেন সেই সময়ে সেটি অনুলিপি করা দূরহ ছিল প্রিন্টিং মেশিন না থাকার কারণে। কারণ কেউ কোনো কপি করতে চাইলে তাকে অক্ষর বাই অক্ষর নিজ হাতে লিখে কপি করতে হতো। ইবনে ইসহাকের ছাত্রের ছাত্র এগিয়ে আসলেন এদিকটা সহজীকরণে। ইবনে হিশামের মৃত্যু ২১০ হিজরীতে। সিরাতে ইবনে ইসহাক ও সিরাতে ইবনে হিশামের মাঝে পার্থক্য কি? পার্থক্য হলো সিরাতে ইবনে ইসহাক থেকেই সিরাতে ইবনে হিশাম করা হয়েছে কেবল ছোট করে। তিনি ভাবলেন সিরাতে ইবনে ইসহাক অনেক বড়, ১০-১৫ খন্ডের মত। তাই তিনি একে সারসংক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি সিরাতে ইবনে ইসহাকে কোনো কিছুই যোগ করেন নি, বরং তিনি এটা থেকে কাট-ছাট করেছেন। তিনি একে সাজানোও নি, বরং অনেক কিছু বাদ দিয়েছেন। সহজ কথায় তিনি একে অনেক কিছুই বাদ দিয়েছেন এবং একে সংক্ষিপ্তাকারে সামারি করে সকলের উপযোগী করেছেন। এখন সিরাতে ইবনে হিশাম ৪ খন্ডে পাওয়া যায়। সুতরাং তিনি একে প্রায় মূল বই এর অর্ধেক বা দুই-তৃতীয়াংশ করেছিলেন।

 

প্রশ্ন আসতে পারে কেন তিনি এত বড় বই রাখলেন না। সহজ কথায় তখন প্রিন্টিং মেশিন ছিল না, যা আগেই বলেছি এবং সবার এত বড় বই কপি করে পড়ার মত অবস্থাও ছিল না।

 

কারণ ইবনে ইসহাক আদম (আলাইহিস সালাম) থেকে শুরু করেছিলেন রাসূলের সিরাত লিখতে গিয়ে। তিনি নূহ, ইবরাহীম (আলাইহিমুস সালাম) এবং রাসূল ﷺ  এর বংশধর পর্যন্ত রেফারেন্স দিয়ে শুরু করেছিলেন। ইবনে হিশাম এগুলোকে কাটছাট করেন, রাসূল ﷺ থেকে শুরু করেন এবং অন্যান্য অনেক বিষয় বাদ দেন যেগুলোকে তিনি অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন এবং সকল সনদকেও কেটে দেন এবং বইকে ছোট করে সবার উপযোগী করেন।

 

আজকের প্রিণ্টিংয়ের যুগে নিশ্চয় সিরতে ইবনে ইসহাক চাইবেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় হলো সেই যুগে ইবনে হিশামের সহজতার কারণে যুগে যুগে ইবনে ইসহাক হারিয়ে গেছে।

 

কারণ যেকেউ কপি করলে ইবনে হিশাম কপি করত এবং এভাবে বড় কিতাব হারিয়ে যায় ইতিহাস থেকে।

 

কিন্তু একটা দারুণ বিষয় লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয় যে হাদীস সংকলিত হওয়ার অনেক আগেই সিরাহ সংকলিত হওয়া শুরু করেছে এবং পূর্ণও হয়েছে!! এ থেকেই উপলব্ধি করা যায় তারা সিরাহর উপর কত বিশাল গুরুত্ব দিতেন। কারণ তাদের নিকট সিরাহ ছিল রাসূলের হেদায়েতপূর্ণ জীবনের ধারাবাহিক বিবরণের পূর্ণ বর্ণনা।

 

সিরাহর শ্রেষ্ট স্কলার হলো ইবনে ইসহাক যিনি মাত্র ১৫০ হিজরীর পূর্বেই এত বড় কিতাব লিখেছিলেন সনদের ধারাবাহিকতা অনুসারে এবং এ থেকেই আমরা এখনও সিরাতে ইবনে হিশাম পাচ্ছি।

 

এখন আমরা যে ইরাতে ইবনে হিশাম পাচ্ছি সেটা যে আসলেই ইবনে ইসহাকের কপি সেটা বুঝবো কীভাবে? এর ব্যাখ্যা আসবে সিরাতের বিশ্বাসযোগ্যতা  অধ্যায়ে।

 

চতুর্থ উৎসঃ শামাইল

 

রাসূল ﷺ এর চারিত্রিক সকল দিকের সুন্দরতম বর্ণনাগুলোর সমষ্টি – একে শামাইল বলে। এগুলোতে জীবনের বিভিন্ন দিকের বর্ণনা থাকে। এদের মাঝে ইমাম তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) এর ‘শাইমায়েলে তিরমিযী’-ই বিখ্যাত।

 

পঞ্চম উৎসঃ দালাইল

 

দালাইল হলো রাসুল ﷺ এর সকল মু’জিযার সংকলন। রাসূলের ﷺ এর জীবনের মু’জিযার উপর অনেক বই রচিত হয়েছে। এটি সিরাহর অন্যতম উৎস ও নবুওয়াতের দালিলিক সত্যতার বলিষ্টতা প্রকাশ করে। দালাইলের সেরা কিতাব হলো ইমাম বায়হাকী (রাহিমাহুল্লাহ) এর “দালাইল আন-নবুওয়াত আল-বায়হাকী”। এটি প্রায় ১২ খন্ডের বিশাল এনসাইক্লোপেডিয়া!।

 

ষষ্ঠ উৎসঃ সাহাবাদের জীবনী

 

সিরাহর আরেকটি উৎস সাহাবাদের জীবনী এবং এখান থেকে রাসূলের জীবনীকে আলাদা করে শিক্ষা বের করা।

 

সপ্তম উতসঃ তারিখ বা ইতিহাস

 

অনেকেই মক্কা-মদিনার ইতিহাস লিখেছেন এবং সেখানেও সিরাহর অনেক অংশ রয়েছে সেগুলো থেকেও সিরাহ নেওয়া হয়। এ ইতিহাসের মাঝে অনেক নন-মুসলিমও রয়েছে সেই প্রাচীনকালেও। রাসূলের জীবনের সেই ১০০ বছরেই প্রায় তারা রাসূলের কথা লিখেছে তাদের বইতে।

 

অষ্টম উৎসঃ আধুনিক বই ও ভিডিও

 

আধুনিককালে সিরাহর উপর অনেক ভালো কাজ হয়েছে। এর মাঝে আমরা সিরাহর উদ্দেশ্য এর জায়গায় অনেক আলেম-স্কলারদের নাম উল্লেখ করেছি এবং এদের রেফারেন্স আমরা রিসোর্সের মধ্যে দেবো।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

Information

This entry was posted on August 20, 2015 by in আখলাক, বই পরিচিতি, রিসোর্স, স্কলার ও দাঈ পরিচিত and tagged , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , , .
%d bloggers like this: